بِسْمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحْمَـٰنِ ٱلرَّحِيمِ - শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।

চার ইমামের আকীদাহ

চার ইমামের আকীদাহ

মসজিদে নববীর ইমাম ও খতীব:
এবং বিচারপতি মদীনা মুনাওয়ারা সাধারণ বিচারালয়
সালাহ বিন মুহাম্মাদ আল-বুদায়ের

প্রশ্ন: যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়: তোমার রব কে?
উত্তর: বলুন, আমার রব আল্লাহ। তিনি সবকিছুর মালিক, স্রষ্টা, ব্যবস্থাপক, আকৃতি দানকারী, অভিভাবক ও বান্দাদের সংশোধনকারী এবং তাদের যাবতীয় বিষয়াদির আঞ্জাম দাতা। তার নির্দেশ ব্যতীত কোনো কিছুই অস্তিত্ব লাভ করে না এবং তার ইচ্ছা ও অনুমতি ব্যতীত কোনো স্থির বস্তু নড়াচড়া করে না।
প্রশ্ন: যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তোমার রবকে কিভাবে চিনতে পেরেছ?

উত্তর: তাহলে তুমি বল, তার সম্পর্কে ইলম, তার অস্তিত্ব সম্পর্কে স্বভাবজাত স্বীকৃতি, তার সম্মান ও ভীতি আর ক্ষমতা যা দিয়ে তিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন সে সবের আলোকেই আমি তাকে চিনেছি। যেমনি ভাবে আমি তাকে চিনেছি তার নিদর্শনসমূহ ও সৃষ্টিগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিয়ে ও চিন্তা-গবেষণা করে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمِنۡ ءَايَٰتِهِ ٱلَّيۡلُ وَٱلنَّهَارُ وَٱلشَّمۡسُ وَٱلۡقَمَرُۚ لَا تَسۡجُدُواْ لِلشَّمۡسِ وَلَا لِلۡقَمَرِ وَٱسۡجُدُواْۤ لِلَّهِۤ ٱلَّذِي خَلَقَهُنَّ إِن كُنتُمۡ إِيَّاهُ تَعۡبُدُونَ ٣٧﴾ [فصلت: ٣٧]

“আর তার নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে রাত, দিন, সূর্য ও চন্দ্র”। [সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩৭] এই সু-শৃঙ্খল, সুক্ষ্ম ও সুন্দর বিশাল এ সৃষ্ট-জগত নিজে নিজে কখনো সৃষ্ট হতে পারে না। অবশ্যই অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিত্বে আনয়ন করার জন্য তার স্রষ্টা রয়েছে। এটিই শক্তিশালী, মহান ও প্রজ্ঞাময় স্রষ্টার অস্তিত্বের বড় প্রমাণ। প্রত্যেক মাখলুক তাদের স্রষ্টা, মালিক, রিযিক দাতা ও তাদের বিষয়াদির ব্যবস্থাপককে স্বীকার করে। তবে মুষ্টিমেয় কতক নাস্তিক ব্যতীত। তার মাখলুকের মধ্যে আরো রয়েছে সাত আসমান, সাত যমীন ও তার অন্তর্ভুক্ত মাখলুকসমূহ, যার সংখ্যা, হাকীকত ও অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ জানে না এবং তাদের রক্ষণাবেক্ষণ ও রিযিকের ব্যবস্থা মহান স্রষ্টা, চিরঞ্জীব ও সবকিছুর ধারক আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ করে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِۖ يُغۡشِي ٱلَّيۡلَ ٱلنَّهَارَ يَطۡلُبُهُۥ حَثِيثٗا وَٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَ وَٱلنُّجُومَ مُسَخَّرَٰتِۢ بِأَمۡرِهِۦٓۗ أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُۗ تَبَارَكَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٥٤﴾ [الاعراف: ٥٣]

“নিশ্চয় তোমাদের রব হলেন আল্লাহ, যিনি ছয় দিনে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন অতঃপর আরশে আরোহণ করেছেন। তিনি দিনকে রাত দ্বারা ঢেকে দেন, ফলে ওদের একে অন্যকে অতি দ্রুত অন্বেষণ করে। আর সূর্য, চাঁদ ও তারকারাজিকে তাঁর নির্দেশের অধীন করেছেন। জেনে রাখ, সৃষ্টি ও নির্দেশ তাঁরই। মহা বিশ্বের রব বরকতময় আল্লাহ।” [সূরা আরাফ, আয়াত: ৫৪]

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তোমার দীন কি?

উত্তর: তখন বল, আমার দীন ইসলাম। আর ইসলাম হচ্ছে তাওহীদের সাথে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করা, আনুগত্যের সাথে তার বশ্যতা মেনে নেওয়া এবং শির্ক ও মুশরিকদের থেকে মুক্ত হওয়া। যেমন— আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿إِنَّ ٱلدِّينَ عِندَ ٱللَّهِ ٱلۡإِسۡلَٰمُ ١٩﴾ [ال عمران: ١٩]

“নিশ্চয় আল্লাহর নিকট দীন হচ্ছে ইসলাম।” [সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৯] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন: “আর যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দীন চায় তার কাছ থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” [সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ৮৫] আল্লাহ কোনো দীন গ্রহণ করবেন না একমাত্র তার দীন ব্যতীত, যা দিয়ে তিনি আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণ করেছেন। কারণ, তাঁর দ্বীন পূর্বের সকল শরীয়তকে রহিতকারী। অতএব ইসলাম ব্যতীত যে অন্য দীন অন্বেষণ করবে সে হিদায়াত থেকে বিচ্যুত এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে ও জাহান্নামে প্রবেশ করবে। জাহান্নাম খুব নিকৃষ্ট ঠিকানা।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ঈমানের রুকনগুলো কী কী?

উত্তর: তুমি বল, ঈমানের রুকন ছয়টি। আর তা হচ্ছে, তুমি ঈমান আনবে আল্লাহর প্রতি, তার ফিরিশতা, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ ও পরকাল দিবসের প্রতি। তুমি আরো ঈমান আনবে, ভালো ও মন্দ—সবকিছুর তাকদীরের প্রতি।

আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত যেভাবে প্রমাণ করে সেভাবে এসকল রুকনসমূহের ওপর ঈমান আনা ছাড়া কারো ঈমান পূর্ণ হবে না। আর যে কেউ এর একটি অস্বীকার করবে, সে ঈমানের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাবে। এর ওপর প্রমাণ হলো, আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿لَّيۡسَ ٱلۡبِرَّ أَن تُوَلُّواْ وُجُوهَكُمۡ قِبَلَ ٱلۡمَشۡرِقِ وَٱلۡمَغۡرِبِ وَلَٰكِنَّ ٱلۡبِرَّ مَنۡ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ وَٱلۡكِتَٰبِ وَٱلنَّبِيِّ‍ۧنَ وَءَاتَى ٱلۡمَالَ عَلَىٰ حُبِّهِۦ ذَوِي ٱلۡقُرۡبَىٰ وَٱلۡيَتَٰمَىٰ وَٱلۡمَسَٰكِينَ وَٱبۡنَ ٱلسَّبِيلِ وَٱلسَّآئِلِينَ وَفِي ٱلرِّقَابِ وَأَقَامَ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتَى ٱلزَّكَوٰةَ وَٱلۡمُوفُونَ بِعَهۡدِهِمۡ إِذَا عَٰهَدُواْۖ وَٱلصَّٰبِرِينَ فِي ٱلۡبَأۡسَآءِ وَٱلضَّرَّآءِ وَحِينَ ٱلۡبَأۡسِۗ أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ صَدَقُواْۖ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُتَّقُونَ ١٧٧ ﴾ [البقرة: ١٧٧]

“ভালো কাজ এটা নয় যে, তোমরা তোমাদের চেহারা পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ফিরাবে; বরং ভালো কাজ হল যে ঈমান আনে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফিরিশতাগণ, কিতাব ও নবীগণের প্রতি এবং যে সম্পদ প্রদান করে তার প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও নিকটাত্মীয়গণকে, ইয়াতীম, অসহায়, মুসাফির ও প্রার্থনাকারীকে এবং বন্দি মুক্তিতে এবং যে সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং যারা অঙ্গীকার করে তা পূর্ণ করে, যারা ধৈর্যধারণ করে কষ্ট ও দুর্দশায় ও যুদ্ধের সময়ে। তাঁরাই সত্যবাদী ও মুত্তাকী”। [সূরা বাকারা, আয়াত: ১৭৭]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যখন ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, তখন তিনি বলেছেন, “তুমি ঈমান আনবে আল্লাহ, ফিরিশতা, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, পরকাল দিবস ও ভালো-মন্দের তাকদীরের প্রতি”। (এটি বর্ণনা করেছেন সহীহ মুসলিম)

প্রশ্ন: যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আল্লাহু সুবহানাহুর প্রতি ঈমান কিভাবে হয়?

উত্তর: বল, আল্লাহর প্রতি ঈমান হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার অস্তিত্ব এবং তার রুবুবিয়্যাত, উলুহিয়্যাত ও তার নাম ও সিফাতসমূহের প্রতি ঈমান আনা এবং তাঁর একত্বের প্রতি বিশ্বাস, সত্যায়ন ও স্বীকার করা দ্বারা।

প্রশ্ন: যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ফিরিশতাদের প্রতি ঈমান কিভাবে আনা হয়?

উত্তর: বল, ফিরিশতাদের প্রতি ঈমান হচ্ছে, তাদের অস্তিত্ব, গুণাবলি, ক্ষমতা, কাজ এবং তাদের যা নির্দেশ করা হয় তা পালন করা ইত্যাদির প্রতি সত্যায়ন ও দৃঢ় বিশ্বাস রাখা। সেই সঙ্গে আরো বিশ্বাস করা যে, তারা আল্লাহর মর্যাদাবান মহান সৃষ্টি। আল্লাহ তাদেরকে নূর দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَّا يَعۡصُونَ ٱللَّهَ مَآ أَمَرَهُمۡ وَيَفۡعَلُونَ مَا يُؤۡمَرُونَ ٦﴾ [التحريم: ٦]
“আল্লাহ তাদেরকে যে নির্দেশ দিয়েছেন সে ব্যাপারে তারা অবাধ্য হয় না। আর তারা তাই করে যা তাদেরকে আদেশ করা হয়”। [সূরা আত-তাহরীম: ৬] তাদের পাখা রয়েছে দু’টো দু’টো, তিনটে তিনটে, চারটে চারটে এবং তার চেয়েও অধিক। তাদের সংখ্যা অনেক। আল্লাহ ব্যতীত তাদের সংখ্যা কেউ জানে না। আল্লাহ তাদেরকে বড় বড় অনেক দায়িত্ব দিয়েছেন। তাদের কেউ আরশের ধারক, কেউ মাতৃগর্ভের দায়িত্বে, কেউ আমল সংরক্ষণ করার কাজে, কেউ বান্দাদের হিফাযত করার কাজে, কেউ জান্নাত ও জাহান্নামের পাহারাদারি প্রভৃতি গুরু দায়িত্বে নিয়োজিত। আর তাদের মধ্যে সর্বোত্তম হলেন জিবরীল আলাইহিস সালাম। তিনি নবীদের ওপর নাযিলকতৃ অহীর দায়িত্বে নিয়োজিত। অতএব আমরা তাদের ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিতভাবে ঈমান আনব। যেরূপ সংবাদ দিয়েছেন আমাদের রব তার কিতাবে ও তার রাসূল স্বীয় সুন্নতে। সুতরাং যে ব্যক্তি ফিরিশতাদের অস্বীকার করবে কিংবা মনে করবে, তাদের হাকীকত আল্লাহ যেরূপ সংবাদ দিয়েছেন সেরূপ নয় সে কাফির। কারণ, সে আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সংবাদকে অস্বীকার করেছে।

প্রশ্ন: তোমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, আসমানী কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান কীভাবে আনয়ন করতে হয়?

উত্তর:  তুমি বল যে, আপনার এ বিশ্বাস করা ও সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ তা‘আলা তার নবী ও রাসূলগণের ওপর অনেক কিতাব নাযিল করেছেন। তা থেকে কতিপয় তার কিতাবে উল্লেখ করেছেন। যেমন ইবরাহীমের সহীফা, তাওরাত, ইঞ্জীল, যাবূর ও কুরআন। ইবরাহীমের সহীফাগুলো ইবরাহীমের ওপর, তাওরাত মূসার ওপর, ইঞ্জীল ঈসার ওপর, যাবূর দাউদের ওপর ও কুরআন শেষ নবী মুহাম্মাদের ওপর নাযিল হয়েছে। তাদের সবার ওপর সালাত ও সালাম।

এসবের মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে কুরআন। এটি আল্লাহর কালাম। তিনি কুরআন দিয়ে প্রকৃতপক্ষে কথা বলেছেন। তার শব্দ ও অর্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে। তিনি এটা জিবরীলকে শুনিয়েছেন এবং তার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তা পৌঁছানোর নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “এটা নিয়ে জিবরীল অবতরণ করেছেন”। [আশ-শুআরা, আয়াত: ১৯৩] তিনি আরো বলেন: “নিশ্চয় আমি তোমার প্রতি পর্যায়ক্রমে কুরআন নাযিল করেছি”। [সূরা ইনসান, আয়াত: ২৩] তিনি আরো বলেন:  فأجره حتى يسمع كلام الله“অতঃপর তাকে আশ্রয় দাও যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পারে”। [সুরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৬]

আল্লাহ তা‘আলা কুরআনকে বিকৃতি, বৃদ্ধি ও হ্রাস থেকে হিফাযত করেছেন। এটি শেষ যামানায় কিয়ামত কায়েম হওয়ার পূর্বে মুমিনদের মৃত্যু পর্যন্ত কাগজে ও বক্ষদেশে সংরক্ষিত থাকবে। অতঃপর আল্লাহ এটি উঠিয়ে নিবেন। ফলে তার কোনো অংশ আর অবশিষ্ট থাকবে না।

প্রশ্ন: যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয় নবী ও রাসূলগণের প্রতি ঈমান কিভাবে আনা হয়?

উত্তর: বল, আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি যে, তারা মানুষ এবং তারা বনী আদম থেকে মনোনীত ব্যক্তিবর্গ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর বান্দাদের ওপর যে শরীয়ত নাযিল করেছেন, তা পৌঁছানোর জন্য তাদেরকে বাঁচাই ও নির্বাচন করেছেন। তারা তাদেরকে আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করেন, যিনি একক, যার কোনো শরীক নেই এবং শির্ক ও মুশরিকদের থেকে মুক্ত থাকতে বলেন। নবুওয়াত আল্লাহর মনোনয়ন ও নির্বাচন, যা নিজের পরিশ্রম, অধিক ইবাদত, যোগ্যতা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে হাসিল করা যায় না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿ٱللَّهُ أَعۡلَمُ حَيۡثُ يَجۡعَلُ رِسَالَتَهُۥ ١٢٤﴾ [الانعام: ١٢٤] “আল্লাহ ভালো জানেন কোথায় তিনি স্বীয় রিসালাত রাখবেন”। [সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১২৪]

নবীদের মধ্যে সর্বপ্রথম হলেন আদম আলাইহিস সালাম। আর সর্বপ্রথম রাসূল হলেন নূহ আলাইহিস সালাম। আর তাদের মধ্যে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ হলেন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ আল-কুরাইশী আল-হাশেমী। আল্লাহর অসংখ্য সালাত ও সালাম তাদের সবার ওপর। যে কেউ একজন নবীকে অস্বীকার করবে সে কাফির। আর যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে যে নবুওয়াতের দাবি করবে সেও কাফির এবং আল্লাহকে অস্বীকারকারী। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “মুহাম্মাদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন। তিনি আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী”। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “আমার পরে কোনো নবী নেই”।

প্রশ্ন:যদি তোমাকে বলা হয়, পরকাল দিবসের প্রতি ঈমান কিভাবে আনা হয়?

উত্তর: উত্তর: বল, মৃত্যুর পর যা কিছু হবে বলে আল্লাহ সংবাদ দিয়েছেন সেগুলোর প্রতি কোন প্রকার সন্দেহ ছাড়া দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস ও স্বীকার করা দ্বারাই আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমান আনা হয়। যেমন, কবরের প্রশ্ন, কবরের নি‘আমত ও আযাব, পুনরুত্থান, হিসাব ও ফয়সালার জন্য সমস্ত মখলুককে একত্রিত করা ইত্যাদি। এ ছাড়াও কিয়ামতের ময়দানে আরো যা কিছু সংঘটিত হবে, তার ওপর বিশ্বাস করা, যেমন— দীর্ঘ অবস্থান, সূর্য এক মাইল পরিমাণ নিকটে চলে আসা, হাউয, মীযান, আমলনামা প্রদান, জাহান্নামের ওপর পুলসিরাত স্থাপন প্রভৃতি ঘটনা। জান্নাতিরা জান্নাতে ও জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ না করা পর্যন্ত আরো যেসব ভয়ানক ঘটনা সে মহান দিনে ঘটবে সেগুলোর বর্ণনা যেভাবে আল্লাহর কিতাবে ও তার রাসূলের সুন্নাতে এসেছে সেভাবেই বিশ্বাস করা। কিয়ামতের যেসব আলামত দলীল-প্রমাণ দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে, সেগুলোর প্রতি ঈমান আনাও পরকাল দিবসের ওপর ঈমান আনার মধ্যে শামিল। যেমন- ব্যাপক যুদ্ধ-বিগ্রহ, হত্যা, ভূমিকম্প, ভূমি ধস, দাজ্জাল বের হওয়া, ঈসা আলাইহিস সালাম অবতরণ করা, ইয়াজুজ-মাজুজ বের হওয়া, পশ্চিম আকাশে সূর্য উদিত হওয়া ইত্যাদি।


এসবই আল্লাহর কিতাব ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহীহ হাদীসসমূহে প্রমাণিত, যা সহীহ, সুনান ও মুসনাদের গ্রন্থাবলীতে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

প্রশ্ন: যদি তোমাকে বলা হয়, কবরের আযাব ও তার শান্তি কি কুরআন ও সুন্নাহে প্রমাণিত?

উত্তর: বল, হ্যাঁ, আল্লাহ তা`আলা ফির`আউন সম্প্রদায় সম্পর্কে বলেছেন:

﴿ٱلنَّارُ يُعۡرَضُونَ عَلَيۡهَا غُدُوّٗا وَعَشِيّٗاۚ وَيَوۡمَ تَقُومُ ٱلسَّاعَةُ أَدۡخِلُوٓاْ ءَالَ فِرۡعَوۡنَ أَشَدَّ ٱلۡعَذَابِ ٤٦﴾ [غافر: ٤٦] 

“সকাল-সন্ধ্যায় তাদেরকে আগুনের কাছে উপস্থিত করা হয়। আর যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে (সেদিন ঘোষণা করা হবে), ফিরআউনের অনুসারীদেরকে কঠোরতম আযাবে প্রবেশ করাও”। [সূরা গাফির, আয়াত: ৪৬]
অপর আয়াতে বলেন,

﴿وَلَوۡ تَرَىٰٓ إِذۡ يَتَوَفَّى ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ يَضۡرِبُونَ وُجُوهَهُمۡ وَأَدۡبَٰرَهُمۡ وَذُوقُواْ عَذَابَ ٱلۡحَرِيقِ ٥٠﴾ [الانفال: ٥٠] 

“আর যদি তুমি দেখতে, যখন ফিরিশতারা কাফিরদের প্রাণ হরণ করছিল, তাদের চেহারায় ও পশ্চাতে আঘাত করছিল, আর (বলছিল) ‘তোমরা জ্বলন্ত আগুনের আযাব আস্বাদন কর”। [সূরা আনফাল, আয়াত: ৫০]
﴿يُثَبِّتُ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ بِٱلۡقَوۡلِ ٱلثَّابِتِ فِي ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا وَفِي ٱلۡأٓخِرَةِۖ ٢٧﴾ [ابراهيم: ٢٧] 

অপর আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ ঈমানদারদেরকে দুনিয়াতে ও আখিরাতে সুদৃঢ় বাণীর ওপর অবিচল রাখেন”। [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ২৭]
আর বারা‘ ইবন আযিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে একটি দীর্ঘ কুদসী হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, তাতে বলা হয়, “অতঃপর আসমান থেকে একজন ঘোষক ঘোষণা দিবে, আমার বান্দা সত্য বলেছে। অতএব তাকে জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও, তাকে জান্নাতের পোশাক পরিয়ে দাও এবং তার জন্য একটি দরজা জান্নাতের দিকে খুলে দাও। ফলে তার নিকট জান্নাতের সুবাতাস ও সুঘ্রাণ আসতে থাকবে এবং তার কবরকে তার জন্য চোখের দৃষ্টি পর্যন্ত প্রশস্ত করা হবে।” আর কাফিরের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করে বলেন, “অতঃপর তার রূহকে তার শরীরে ফেরত দেওয়া হবে এবং তার নিকট দু’জন ফিরিশতা আসবে এবং তাকে বসাবে। অতঃপর তাকে প্রশ্ন করবে, তোমার রব কে? ফলে সে বলবে, হাহা হাহা আমি জানি না। অতঃপর তারা তাকে বলবেন, তোমার দীন কি? সে বলেব, হাহা হাহা আমি জানি না। অতঃপর তারা তাকে বলবেন, এই যে লোকটিকে তোমাদের মধ্যে প্রেরণ করা হয়েছিল তিনি কে? সে বলবে, হাহা হাহা আমি জানি না। অতঃপর আসমান থেকে এক ঘোষক ঘোষণা দেবে যে, সে মিথ্যা বলেছে। অতএব তার জন্য জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দাও, তাকে জাহান্নামের পোশাক পরিয়ে দাও এবং তার জন্য জাহান্নামের দিকে একটি দরজা খুলে দাও। ফলে জাহান্নামের গরম বাতাস ও বিষ-বাষ্প তার কাছে আসতে থাকবে এবং তার কবরকে তার ওপর এত সংকীর্ণ করা হয় যে, তার এক পাশের হাঁড় অপর পাশের হাঁড়ে প্রবেশ করবে”। অপর বর্ণনায় বৃদ্ধি করা সহ এভাবে আছে যে, “অতঃপর তার জন্য নিযুক্ত করা হয় অন্ধ ও বধির ফিরিশতাকে। তার সাথে থাকবে লোহার হাতুড়ি, যদি তা দ্বারা পাহাড়কে আঘাত করা হয়, তবে সেটিও মাটিতে পরিণত হয়ে যাবে। আর সে তা দিয়ে তাকে এমন একটি আঘাত করবে, যা জিন ও মানুষ ব্যতীত পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যকার সবাই শুনতে পায়। আবু দাউদ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এ জন্যই প্রত্যেক সালাতে আমাদেরকে কবরের আযাব থেকে আশ্রয় চাইতে আদেশ করা হয়েছে।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে বলা হয়, আখিরাতে মুমিনরা কি তাদের রবকে দেখবে?
উত্তর: বল, হ্যাঁ, তারা আখিরাতে তাদের রবকে দেখবে। তার স্বপক্ষে দলীল হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿ وُجُوهٞ يَوۡمَئِذٖ نَّاضِرَةٌ ٢٢ إِلَىٰ رَبِّهَا نَاظِرَةٞ ٢٣ ﴾ [القيامة: ٢٢،  ٢٣] 

“সেদিন কতক মুখমণ্ডল হবে হাস্যোজ্জল। তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে”। [সূরা আল-কিয়ামাহ, আয়াত: ২২-২৩] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তোমরা অবশ্যই তোমাদের রবকে দেখবে”। হাদীসটি সহীহ বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন। মুমিনগণ তাদের মহান রবকে দেখার বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সাহাবীগণ এবং উত্তমভাবে তাদের অনুসারীরা এ ব্যাপারে ঐক্যমত্য পোষণ করেছেন। অতএব যে আল্লাহর দিদার অস্বীকার করল সে আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরোধিতা করল এবং সাহাবীগণ ও উত্তমভাবে তাদের অনুসারী মুমিনদের পথের বিরুদ্ধাচরণ করল। তবে দুনিয়াতে দেখা সম্ভবপর নয়। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা তোমাদের রবকে মৃত্যুর পূর্বে দেখতে পাবে না”। অধিকন্তু আল্লাহর নবী মুসা আলাইহিস সালাম যখন দুনিয়াতে আল্লাহকে দেখার আবেদন করেছিলেন, তখন তিনি বলেছেন, তুমি আমাকে দেখতে পারবে না। যেমন- তার বাণীতে এসেছে—

﴿وَلَمَّا جَآءَ مُوسَىٰ لِمِيقَٰتِنَا وَكَلَّمَهُۥ رَبُّهُۥ قَالَ رَبِّ أَرِنِيٓ أَنظُرۡ إِلَيۡكَۚ قَالَ لَن تَرَىٰنِي ١٤٣﴾ [الاعراف: ١٤٢] 

 “আর যখন আমার নির্ধারিত সময়ে মূসা এসে গেল এবং তার রব তার সাথে কথা বললেন। সে বলল, হে আমার রব, আপনি আমাকে দেখা দিন, আমি আপনাকে দেখব। তিনি বললেন, তুমি আমাকে কখনো দেখবে না”। [সূরা আরাফ, আয়াত: ১৪৩]
প্রশ্ন: যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ক্বাযা ও কাদার বা তাকদীর এর প্রতি ঈমান কিভাবে আনা হয়?
উত্তর: বল, দৃঢ়ভাবে এই বিশ্বাস করা দ্বারা যে, প্রত্যেক বস্তু আল্লাহর নির্ধারণ ও তাকদীর অনুযায়ী হয়। তার ইচ্ছা ব্যতীত কোনো কিছুই হয় না। তিনি বান্দাদের ভালো-মন্দ কর্মসমূহের স্রষ্টা। তিনিই বান্দাদেরকে কল্যাণ ও সত্য কবুল করার স্বভাব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তাদেরকে প্রার্থক্যকারী বিবেক দিয়েছেন। আর তাদের দিয়েছেন ইচ্ছা, যা দ্বারা তারা গ্রহণ করবে। তাদের জন্য সত্যকে সুস্পষ্ট করেছেন এবং বাতিল থেকে সতর্ক করেছেন। স্বীয় অনুগ্রহে যাকে চান হিদায়াত দেন এবং যাকে ইচ্ছা স্বীয় ইনসাফের ভিত্তিতে গোমরাহ করেন। তিনি হিকমত-পূর্ণ, প্রজ্ঞাবান ও দয়ালু। তিনি যা করেন, সে সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করা যাবে না, তবে তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে।

তাকদীরের স্তর চারটি। যেমন,

প্রথম স্তর: আল্লাহর ইলমের প্রতি ঈমান আনা যে, তিনি প্রত্যেক জিনিসকে বেষ্টনকারী। যা হয়েছে এবং যা হবে, আর যা হয়নি, যদি হতো তা কিভাবে হবে, এ সব বিষয়ে তিনি অবশ্যই জ্ঞাত।

দ্বিতীয় স্তর: ঈমান আনা যে, আল্লাহ প্রত্যেক জিনিষ লিখে রেখেছেন।

তৃতীয় স্তর: ঈমান আনা যে, তার ইচ্ছা ব্যতীত কোনো কিছুই হয় না।

চতুর্থ স্তর: ঈমান আনা যে, আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা। তিনিই বস্তুর সত্তা, কর্ম, কথা, নড়াচড়া, স্থিরতা এবং ঊর্ধ্ব জগত ও নিম্ন জগতের সকল বস্তুর গুণাগুণ সৃষ্টিকারী। উক্ত বক্তব্যের দলীল-প্রমাণসমূহ কুরআন ও হাদীসে প্রচুর রয়েছে।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, মানুষ কি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইচ্ছায় চালিত না ইচ্ছাধীন?
উত্তর: বল, মানুষ কি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইচ্ছায় চালিত না কি সম্পূর্ণরূপে নিজের ইচ্ছাধীন, -এক বাক্যে কোন কথাই প্রযোজ্য হবে না। তাই উভয় কথাই ভুল। কিতাব ও সুন্নাত প্রমাণ করে যে, মানুষের ইচ্ছা ও চাওয়া উভয়টি রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সে কর্ম সম্পাদনকারী। তবে কোনোটিই আল্লাহর ইলম, ইচ্ছা ও চাওয়ার বাইরে নয়। এটি স্পষ্ট করছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿لِمَن شَآءَ مِنكُمۡ أَن يَسۡتَقِيمَ ٢٨ وَمَا تَشَآءُونَ إِلَّآ أَن يَشَآءَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٢٩﴾ [التكوير: ٢٨،  ٢٩] 

“তোমাদের যে কেউ সরল পথে চলতে চায়। আর তোমরা ইচ্ছা করতে পার না, যদি না সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ ইচ্ছা করেন”। [সূরা তাকবীর, আয়াত: ২৮-২৯] অন্যত্র বলেন,

﴿وَمَا يَذۡكُرُونَ إِلَّآ أَن يَشَآءَ ٱللَّهُۚ هُوَ أَهۡلُ ٱلتَّقۡوَىٰ وَأَهۡلُ ٱلۡمَغۡفِرَةِ ٥٦﴾ [المدثر: ٥٦] 

“অতএব যার ইচ্ছা সে তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করুক। আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কেউ উপদেশ গ্রহণ করতে পারে না। তিনিই ভয়ের যোগ্য এবং ক্ষমার অধিকারী”। [আল-মুদ্দাসসির, আয়াত: ৫৫-৫৬]
প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আমল ব্যতীত ঈমান কি বিশুদ্ধ হয়?
উত্তর: বল, আমল ব্যতীত ঈমান শুদ্ধ হয় না। বরং আমল অবশ্যই জরুরী। কারণ, আমল ঈমানের একটি রুকন। যেমন- মুখের স্বীকৃতি তার অন্য একটি রুকন। এর ওপর ইমামগণ একমত হয়েছেন যে, ঈমান হচ্ছে মুখে স্বীকার ও আমল করার সমষ্টি। তার দলীল আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

 ﴿وَمَن يَأۡتِهِۦ مُؤۡمِنٗا قَدۡ عَمِلَ ٱلصَّٰلِحَٰتِ فَأُوْلَٰٓئِكَ لَهُمُ ٱلدَّرَجَٰتُ ٱلۡعُلَىٰ ٧٥﴾ [طه: ٧٥]   

“আর যারা তার নিকট আসবে মুমিন অবস্থায়, সৎকর্ম করে তাদের জন্যই রয়েছে সুউচ্চ মর্যাদা”। [সূরা ত্বাহা, আয়াত: ৭৫]
এখানে আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতে যাওয়ার জন্য ঈমান ও আমল উভয়টিকে শর্ত করেছেন।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ইসলামের রুকনগুলো কী কী?
উত্তর: বল, ইসলামের রুকন পাঁচটি। আর সেগুলো হচ্ছে এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। সালাত কায়েম করা, রামাযানের সিয়াম পালন করা, যাকাত দেওয়া ও বায়তুল্লাহর হজ্জ করা।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি। এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। সালাত কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, হজ করা ও রামাযানের সিয়াম পালন করা। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, -এ কথার অর্থ কি?
উত্তর: বল, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, এই সাক্ষ্য দেওয়ার অর্থ, আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার কোনো মাবুদ নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَإِذۡ قَالَ إِبۡرَٰهِيمُ لِأَبِيهِ وَقَوۡمِهِۦٓ إِنَّنِي بَرَآءٞ مِّمَّا تَعۡبُدُونَ ٢٦ إِلَّا ٱلَّذِي فَطَرَنِي فَإِنَّهُۥ سَيَهۡدِينِ ٢٧ وَجَعَلَهَا كَلِمَةَۢ بَاقِيَةٗ فِي عَقِبِهِۦ لَعَلَّهُمۡ يَرۡجِعُونَ ٢٨﴾ 
[الزخرف: ٢٦،  ٢٨] 

“আর স্মরণ কর যখন ইবরাহীম স্বীয় পিতা ও তার কওমকে বলেছিল, তোমরা যেগুলোর ইবাদত কর, নিশ্চয় আমি তাদের থেকে মুক্ত। তবে তিনি ছাড়া যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর নিশ্চয় তিনি আমাকে শীঘ্রই হিদায়াত দিবেন। আর এটিকে সে তার উত্তরসূরিদের মধ্যে এক চিরন্তন বাণী বানিয়ে রেখে গেল, যাতে তারা সেদিকেই প্রত্যাবর্তন করতে পারে”। [আয-যুখরুফ, আয়াত: ২৮] অপর আয়াতে বলেন,

﴿ذَٰلِكَ بِأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدۡعُونَ مِن دُونِهِ ٱلۡبَٰطِلُ وَأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡكَبِيرُ ٣٠﴾ [لقمان: ٣٠] 

“এগুলো প্রমাণ করে যে, নিশ্চয় আল্লাহই সত্য এবং তারা আল্লাহর পরিবর্তে যাকে ডাকে, তা বাতিল। নিশ্চয় আল্লাহই হলেন সর্বোচ্চ, সুমহান”। [সূরা লুকমান, আয়াত: ২৯]
আর মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, এই সাক্ষ্য দেওয়ার অর্থ, আমরা বিশ্বাস ও স্বীকার করি যে, তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। তিনি বান্দা, তার ইবাদত করা যাবে না, তিনি নবী, অস্বীকার করা যাবে না। তিনি যা নির্দেশ করেন তা মানতে হবে এবং যে সংবাদ দেন, তা বিশ্বাস করতে হবে। তিনি যা থেকে নিষেধ ও সতর্ক করেছেন তা থেকে বিরত থাকতে হবে। আর তিনি যা প্রবর্তন করেছেন, তা ব্যতীত অন্য কিছুর মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করা যাবে না।

উম্মতের ওপর তার হক হচ্ছে, সম্মান ও মর্যাদা দান করা, ভালোবাসা এবং প্রত্যেক সময় ও মুহূর্তে নিঃশর্ত ভাবে সাধ্যানুযায়ী তার অনুসরণ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۚ ٣١﴾ [ال عمران: ٣١] 

“বল, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন”। [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ৩১]
প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর শর্তসমূহ কী?
উত্তর: বল, তাওহীদের কালিমাটি শুধু একটি বাক্যই নয় যা বিশ্বাস করা, তার দাবি বাস্তবায়ন ও তা ভঙ্গকারী বিষয়সমূহ থেকে বিরত থাকা ছাড়া কেবল মুখে বলা হবে। বরং তার জন্য সাতটি শর্ত রয়েছে। আলেমগণ শর‘য়ী দলীলসমূহ অনুসন্ধান করে বের করেছেন। অতঃপর কুরআন ও সুন্নাহ প্রমাণসমূহ দ্বারা প্রমাণিত করে তা লিপিবদ্ধ করেছেন। আর সেগুলো হচ্ছে—

১- ইলম: নাকোচ করা ও সাব্যস্ত করাসহ কালিমার অর্থ জানা। এভাবে জানা যে, আল্লাহ এক। তার কোনো শরীক নেই। তিনিই ইবাদতের হকদার। আরো জানা যে, কালিমাটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর ইলাহিয়াতকে নাকোচ করার ওপর প্রমাণ। সেই সঙ্গে কালিমাটির দাবি, তার আবশ্যিক বিষয়সমূহ, তা ভঙ্গকারী বিষয়গুলো জানা, যা অজ্ঞতার বিপরীত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿فَٱعۡلَمۡ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّه ١٩﴾ [محمد : ١٩]   “তুমি জেনে নাও যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই”। [সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ১৯] তিনি আরো বলেন, ﴿إِلَّا مَن شَهِدَ بِٱلۡحَقِّ وَهُمۡ يَعۡلَمُونَ ٨٦﴾ [الزخرف: ٨٦]   “তবে যে সত্যের সাক্ষ্য দিল এমতাবস্থায় যে তারা জানে”। [সূরা যুখরূফ, আয়াত: ৮৬] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে মারা গেল এমতাবস্থায় যে, সে জানে আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে”। (সহীহ মুসলিম)

২- ইয়াকীন: আর সেটি হচ্ছে, তার প্রতি অকাট্য বিশ্বাস, যা সন্দেহ ও সংশয়ের পরিপন্থী। অর্থাৎ, অন্তরে গেঁথে যাওয়া ও সাব্যস্ত হওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّمَا ٱلۡمُؤۡمِنُونَ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ ثُمَّ لَمۡ يَرۡتَابُواْ وَجَٰهَدُواْ بِأَمۡوَٰلِهِمۡ وَأَنفُسِهِمۡ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِۚ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلصَّٰدِقُونَ ١٥﴾ [الحجرات: ١٥] 

 “মুমিন কেবল তাঁরাই, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে, তারপর সন্দেহ পোষণ করেনি। আর নিজেদের সম্পদ ও নিজদের জীবন দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে। এরাই সত্যনিষ্ঠ”। [সূরা হুজুরাত, আয়াত: ২৫] আর রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দিল যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল। এ দু’টি বিষয়ে কোন প্রকার সন্দেহ না করে যে বান্দা আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে, সে জান্নাতে যাবে। (সহীহ মুসলিম)

৩- ইখলাস: এমন ইখলাস বা একনিষ্ঠতা, যা শির্কের সম্পূর্ণ বিপরীত। আর এটি লৌকিকতা বা শির্কের যে কোন কলুষ থেকে এবাদতকে সম্পূর্ণ রূপে মুক্ত ও পবিত্র রাখার মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُۚ ٣﴾ [الزمر: ٣]   “জেনে রেখ আল্লাহর জন্যই বিশুদ্ধ ইবাদত”। [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৩] তিনি আরো বলেন, ﴿وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ وَيُقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَيُؤۡتُواْ ٱلزَّكَوٰةَۚ وَذَٰلِكَ دِينُ ٱلۡقَيِّمَةِ ٥﴾ [البينة: ٥]   “আর তাদেরকে কেবল এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তার জন্যে দীনকে একনিষ্ঠ করে”। [সূরা আল-বাইয়্যিনাহ, আয়াত: ৫] আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “কিয়ামতের দিন আমার সুপারিশ দ্বারা ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে বেশী ভাগ্যবান হবে, যে তার নিজের অন্তর বা আত্মা থেকে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে”। হাদীসটি বর্ণনা করেছেন সহীহ বুখারী।

৪- ভালোবাসা: অর্থাৎ এই কালিমাকে এবং তা যার ওপর প্রমাণ তার প্রতি ভালোবাসা, তা দ্বারা আনন্দিত হওয়া। আর কালিমার ধারকদের ভালোবাসা ও তাদের সাথে সম্পর্ক কায়েম করা এবং তার বিপরীত বস্তুকে ঘৃণা করা ও কাফিরদের থেকে মুক্ত থাকা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ ٱللَّهِ أَندَادٗا يُحِبُّونَهُمۡ كَحُبِّ ٱللَّهِۖ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَشَدُّ حُبّٗا لِّلَّهِۗ ١٦٥﴾ [البقرة: ١٦٥] 

“আর মানুষদের মধ্যে এমনও আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সম্যকরূপে গ্রহণ করে, তাদেরকে আল্লাহর ভালোবাসার মতো ভালোবাসে। আর যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহর জন্য ভালোবাসায় দৃঢ়তর”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৬৫] আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তিনটি স্বভাব যার মধ্যে থাকবে সে অবশ্যই ঈমানের স্বাদ পাবে। আল্লাহ ও তার রাসূল তার নিকট বেশী প্রিয় হবে তাদের ভিন্ন অন্যান্য বস্তু হতে এবং একমাত্র আল্লাহর জন্যই মানুষকে ভালোবাসবে এবং সে কুফরিতে ফিরে যেতে অপছন্দ করবে যেমন সে অপছন্দ করে আগুনে নিক্ষিপ্ত হতে”। (সহীহ মুসলিম)

৫- সত্যবাদিতা, যা মিথ্যার পরিপন্থী: অন্তর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ মুখে তাওহীদের যে কালিমা উচ্চারণ করেছে তার সাথে একাত্মতা পোষণ করার মাধ্যমে তা হতে পারে। সুতরাং, মুখ যা বলছে, অন্তর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ সেটাকে সত্যায়ন করবে। ফলে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ আনুগত্যের মাধ্যমে তা পালন করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿فَلَيَعۡلَمَنَّ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ صَدَقُواْ وَلَيَعۡلَمَنَّ ٱلۡكَٰذِبِينَ ٣﴾ [العنكبوت: ٣]   “ফলে আল্লাহ অবশ্যই জেনে নিবেন, কারা সত্য বলে এবং অবশ্যই তিনি জেনে নেবেন মিথ্যাবাদীদেরকে”। [সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত: ৩] তিনি আরো বলেন, ﴿ وَٱلَّذِي جَآءَ بِٱلصِّدۡقِ وَصَدَّقَ بِهِۦٓ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُتَّقُونَ ٣٣﴾ [الزمر: ٣٣]   “আর যিনি সত্য নিয়ে এসেছেন এবং যে তা সত্য বলে মেনে নিয়েছে, তারাই মুত্তাকী”। [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৩৩] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে অন্তর থেকে সত্য জেনে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল সে জান্নাতে প্রবেশ করবে”। (এটি আহমদ বর্ণনা করেছেন)

৬- আত্মসমর্পন ও আনুগত্য: ইখলাস, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও ভয়-ভীতি সহকারে সকল নির্দেশ পালন ও সমস্ত নিষেধ হতে বিরত থেকে তার হকসমূহ পালন করা এবং ইবাদতে তাকে এক জেনে আল্লাহর জন্য বিনয়াবনত হওয়া দ্বারা আনুগত্য করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿ وَأَنِيبُوٓاْ إِلَىٰ رَبِّكُمۡ وَأَسۡلِمُواْ لَه٥٤﴾ [الزمر: ٥٣]   “আর তোমরা তোমাদের রবের অভিমুখী হও এবং তার কাছে আত্মসমর্পণ কর”। [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৫৪] তিনি আরো বলেন, ﴿وَمَن يُسۡلِمۡ وَجۡهَهُۥٓ إِلَى ٱللَّهِ وَهُوَ مُحۡسِنٞ فَقَدِ ٱسۡتَمۡسَكَ بِٱلۡعُرۡوَةِ ٱلۡوُثۡقَىٰۗ ٢٢﴾ [لقمان: ٢٢]   “আর যে ব্যক্তি একনিষ্ঠ ও বি-শুদ্ধচিত্তে আল্লাহর কাছে নিজকে সমর্পণ করে, সে তো শক্ত রশি আঁকড়ে ধরে”। [সূরা লুকমান, আয়াত: ২২]
৭- কালিমাকে গ্রহণ করা যা প্রত্যাখ্যান করার পরিপন্থী। আর তা অন্তর দিয়ে কালিমা ও তার মর্মার্থ এবং তার দাবিকে গ্রহণ করে নেওয়ার মাধ্যমেই হয়ে থাকে। তবে যে ব্যক্তি নিজস্বার্থে ও অহংকার-বশত তার দিকে আহ্বান করে তার থেকে তা সে গ্রহণ করবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿ إِنَّهُمۡ كَانُوٓاْ إِذَا قِيلَ لَهُمۡ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّهُ يَسۡتَكۡبِرُونَ ٣٥ ﴾ [الصافات : ٣٥]   “তাদেরকে যখন বলা হত লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ তখন তারা অহংকার করত”। [সূরা সাফফাত, আয়াত: ৩৫] যার অবস্থা এরকম সে মুসলিম নয়।

প্রশ্ন: যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তোমার নবী কে?
উত্তর: বল, তিনি হলেন মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুল মুত্তালিব ইবন হাশিম ইবন আব্দু মানাফ। আল্লাহ তাকে কুরাইশ থেকে বাছাই করেছেন, আর কুরাইশরা হচ্ছে ইসমাইল ইবনু ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সন্তানদের সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তাঁকে মানব ও জিন জাতীর নিকট প্রেরণ করেছেন এবং তার ওপর কিতাব ও হিকমত নাযিল করেছেন এবং তাকে সর্বোত্তম রাসূল ও তাদের শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। তার ওপর সালাত ও সালাম।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে বলা হয়, বান্দার ওপর আল্লাহর সর্বপ্রথম ফরয কী?
উত্তর: বল, আল্লাহ তা`আলা বান্দার ওপর প্রথম ফরয করেছেন তার প্রতি ঈমান আনা ও তাগুতকে অস্বীকার করা। যেমন তার বাণীতে রয়েছে,

﴿وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَۖ فَمِنۡهُم مَّنۡ هَدَى ٱللَّهُ وَمِنۡهُم مَّنۡ حَقَّتۡ عَلَيۡهِ ٱلضَّلَٰلَةُۚ فَسِيرُواْ فِي ٱلۡأَرۡضِ فَٱنظُرُواْ كَيۡفَ كَانَ عَٰقِبَةُ ٱلۡمُكَذِّبِينَ ٣٦﴾ [النحل: ٣٦]
 “আর আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতিতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং পরিহার কর তাগূতকে। অতঃপর তাদের মধ্য থেকে আল্লাহ কাউকে হিদায়াত দিয়েছেন এবং তাদের মধ্য থেকে কারো ওপর পথভ্রষ্টতা সাব্যস্ত হয়েছে। সুতরাং তোমরা জমিনে ভ্রমণ কর অতঃপর দেখ, অস্বীকারকারীদের পরিণতি কীরূপ হয়েছে”। [সূরা আন-নাহাল, আয়াত: ৩৬] বান্দা যাকে নিয়ে সীমালঙ্ঘন করে, সেই তাগুত। হোক সে মা‘বূদ অথবা অনুসরণীয় অথবা আনুগত্য প্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব।

প্রশ্ন: যদি তোমাকে বলা হয়, আল্লাহ তোমাকে কেন সৃষ্টি করেছেন?
উত্তর: বল, আল্লাহ এ বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার করে বলেছেন যে, তিনি মানুষ ও জিনকে একমাত্র তার ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করেছেন, তার কোনো শরীক নেই। আর এটি তাঁর নির্দেশ বাস্তবায়ন করা এবং তিনি যা থেকে নিষেধ করেছেন, সেগুলো ত্যাগ করে তার আনুগত্য করার মাধ্যমে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ ٥٦﴾ [الذاريات: ٥٦]   “আর আমি জিন ও মানুষকে কেবল এ জন্যই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার ইবাদত করবে”। [সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৬] তিনি আরো বলেন: ﴿وَٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَلَا تُشۡرِكُواْ بِهِۦ شَيۡ‍ٔٗاۖ ٣٦﴾ [النساء : ٣٦]   “তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তার সাথে কাউকে শরীক করো না”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩৬]
প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ইবাদত অর্থ কী?
উত্তর: বল, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য কথা ও আমলসমূহ থেকে যা আল্লাহ ভালোবাসেন ও যাতে তিনি সন্তুষ্ট হন এবং যা বিশ্বাস করতে, বলতে ও কাজে পরিণত করতে নির্দেশ দিয়েছেন তা সবই ইবাদত। যেমন- তাঁকে ভয় করা, তাঁর কাছে আশা-আকাঙ্ক্ষা করা, তাঁকে ভালোবাসা এবং তাঁর নিকট সাহায্য চাওয়া ও তাঁর কাছে ফরিয়াদ করা, সালাত ও সিয়াম ইত্যাদি সবই ইবাদত।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, দু‘আ কি ইবাদত?
উত্তর: বল, অবশ্যই দু‘আ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাতসমূহের একটি অন্যতম ইবাদত। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَقَالَ رَبُّكُمُ ٱدۡعُونِيٓ أَسۡتَجِبۡ لَكُمۡۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ يَسۡتَكۡبِرُونَ عَنۡ عِبَادَتِي سَيَدۡخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ ٦٠﴾ [غافر: ٦٠]
 “আর তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো। আমি তোমাদের জন্য সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহংকার বশত আমার ইবাদত থেকে বিমুখ হয়, তারা অচিরেই লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে”। [সূরা গাফির, আয়াত: ৬০]
হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “দু‘আই ইবাদত”। হাদীসটি তিরমিযী বর্ণনা করেছেন। দীনের মধ্যে দু‘আর গুরুত্ব ও মর্যাদার জন্যই কুরআনে তিন-শতাধিক আয়াত এ সম্পর্কে এসেছে। দু‘আ দুই প্রকার: ইবাদতের দু‘আ ও চাওয়ার দু‘আ। একটি অপরটির জন্য অত্যাবশ্যকীয়।

ইবাদতের দু‘আ: উদ্দেশ্য হাসিল করা বা বিপদ প্রতিহত করা বা মুসিবত দূর করার জন্য ইখলাসের সাথে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা দ্বারা আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَذَا ٱلنُّونِ إِذ ذَّهَبَ مُغَٰضِبٗا فَظَنَّ أَن لَّن نَّقۡدِرَ عَلَيۡهِ فَنَادَىٰ فِي ٱلظُّلُمَٰتِ أَن لَّآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنتَ سُبۡحَٰنَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ ٱلظَّٰلِمِينَ ٨٧ فَٱسۡتَجَبۡنَا لَهُۥ وَنَجَّيۡنَٰهُ مِنَ ٱلۡغَمِّۚ وَكَذَٰلِكَ نُ‍ۨجِي ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٨٨﴾ [الانبياء: ٨٧،  ٨٨]    

“আর স্মরণ কর মাছ ওয়ালার কথা। যখন সে রাগান্বিত অবস্থায় চলে গিয়েছিল এবং মনে করেছিল যে, আমি তার ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করব না। তারপর সে অন্ধকার থেকে ডেকে বলেছিল, আপনি ছাড়া আর কোনো সত্য ইলাহ নেই। আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয় আমি ছিলাম যালিম। অতঃপর আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম এবং দুশ্চিন্তা থেকে তাকে উদ্ধার করেছিলাম। আর এভাবেই আমি মুমিনদেরকে উদ্ধার করি”। [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭-৮৮]
চাওয়ার দু‘আ: অর্থাৎ দু‘আকারীকে যে জিনিষ উপকার পৌঁছাবে; যেমন কোনো কল্যাণ অর্জন অথবা কোনো অকল্যাণ দূর করার প্রার্থনা করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿ ٱلَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَآ إِنَّنَآ ءَامَنَّا فَٱغۡفِرۡ لَنَا ذُنُوبَنَا وَقِنَا عَذَابَ ٱلنَّارِ ١٦ ﴾ [ال عمران: ١٦]   “যারা বলে, হে আমাদের রব! নিশ্চয় আমরা ঈমান এনেছি। অতএব আমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন”। [সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৬]
উভয় প্রকার দু‘আ ইবাদতের মূল ও নির্যাস। আর তা সবচেয়ে সহজ ইবাদত। আর সম্পাদন করা দিক থেকে সবচেয়ে সহজ। আর মর্যাদা ও ফলাফলের দিক দিয়ে সবচেয়ে মহান। এটিই আল্লাহর ইচ্ছায় অকল্যাণ দূর ও উদ্দেশ্য হাসিল করায় সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়।

প্রশ্ন: তোমাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, আল্লাহর নিকট আমল কবুল হওয়ার শর্তসমূহ কী কী?
উত্তর: বল, দু’টি শর্ত পাওয়া না গেলে আল্লাহর নিকট আমল কবুল হয় না। প্রথম শর্ত: একমাত্র আল্লাহর জন্যে আমল করা। এর দলীল আল্লাহ তাআলার বাণী: ﴿وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ ٥﴾ [البينة: ٥]   “আর তাদেরকে কেবল এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তার জন্য দীনকে একনিষ্ঠ করে”। [সূরা আল-বায়্যিনাহ, আয়াত: ৫] তিনি আরো বলেন, ﴿فَمَن كَانَ يَرۡجُواْ لِقَآءَ رَبِّهِۦ فَلۡيَعۡمَلۡ عَمَلٗا صَٰلِحٗا وَلَا يُشۡرِكۡ بِعِبَادَةِ رَبِّهِۦٓ أَحَدَۢا ١١٠﴾ [الكهف: ١١٠]   “সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে”। [সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ১১০]
দ্বিতীয় শর্ত: আমলটি সেই শরীয়ত মোতাবেক হওয়া, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়ে এসেছেন। এর দলীল আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ ٣١﴾ [ال عمران: ٣١]   “বল, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ কর। ফলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন”। [সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ৩১] আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “যে এমন আমল করল যার ওপর আমাদের আদর্শ নেই, সেটি প্রত্যাখ্যাত”। এটি সহীহ মুসলিম বর্ণনা করেছেন। অতএব আমলটি যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ মোতাবেক না হয়, তাহলে সেটি কবুল করা হবে না। যদিও আমলকারী মুখলিস হয়।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয় আমল ব্যতীত শুধু নিয়তের বিশুদ্ধতা কি যথেষ্ট?
উত্তর: বল, না; বরং নিয়তের শুদ্ধতা তথা একমাত্র আল্লাহর জন্যে আমল করার সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শরীয়ত মোতাবেক আমল হওয়া জরুরী। এর দলীল আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿فَمَن كَانَ يَرۡجُواْ لِقَآءَ رَبِّهِۦ فَلۡيَعۡمَلۡ عَمَلٗا صَٰلِحٗا وَلَا يُشۡرِكۡ بِعِبَادَةِ رَبِّهِۦٓ أَحَدَۢا ١١٠﴾ [الكهف: ١١٠] “সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন ভালো আমল করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে”। [সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ১১০] আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াতে আমল কবুল হওয়ার জন্য নিয়তের বিশুদ্ধতার শর্তারোপ করেছেন। সেই সঙ্গে নেক আমলটি সালেহ হওয়া; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শরী‘আত মোতাবেক হওয়ার শর্তারোপ করেছেন।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তাওহীদের প্রকারগুলো কী কী?
উত্তর: বল, তাওহীদ তিন প্রকার: ১) তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ: আর তা হলো, এ দৃঢ় বিশ্বাস করা যে, আল্লাহই সৃষ্টিকর্তা, রিজিক দাতা, সমস্ত মাখলুকের ব্যব্যস্থাপক, তাঁর কোনো শরীক ও সাহায্যকারী নেই। এটি হলো, আল্লাহকে স্বীয় কর্মসমূহে এক বলে বিশ্বাস করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿هَلۡ مِنۡ خَٰلِقٍ غَيۡرُ ٱللَّهِ يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِۚ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۖ ٣﴾ [فاطر: ٣]   “আল্লাহ ছাড়া আর কোনো স্রষ্টা আছে কি, যে তোমাদেরকে আসমান ও যমীন থেকে রিজিক দিবে? তিনি ছাড়া আর কোনো সত্য ইলাহ নেই”। [সূরা ফাতির, আয়াত: ৩] তিনি আরো বলেন, ﴿إِنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلرَّزَّاقُ ذُو ٱلۡقُوَّةِ ٱلۡمَتِينُ ٥٨﴾ [الذاريات: ٥٨]   “নিশ্চয় আল্লাহ রিযিকদাতা, তিনি শক্তিধর, পরাক্রমশালী”। [সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৮] তিনি আরো বলেন, ﴿يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ إِلَى ٱلۡأَرۡضِ ٥﴾  [السجدة : ٥]  “তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত সকল কার্য পরিচালনা করেন”। [সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত: ৫] তিনি আরো বলেন, ﴿ أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُۗ تَبَارَكَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٥٤﴾ [الاعراف: ٥٣]  “জেনে রাখ, সৃষ্টি ও নির্দেশ তাঁরই। আল্লাহ মহান, যিনি সকল সৃষ্টির রব”। [সূরা আরাফ, আয়াত: ৫৪]
৩) তাওহীদুল আসমা ওয়াস-সিফাত: কুরআন ও হাদীসে আল্লাহ তা‘আলার যেসব অতি সুন্দর নাম ও পূর্ণতার গুণাবলী রয়েছে, কোন প্রকার ধরণ, উদাহরণ বর্ণনা করা এবং বিকৃতি ও অকার্যকর করা ছাড়াই তাতে দৃঢ় বিশ্বাস করাকে তাওহীদুল আসমা ওয়াস্ সিফাত বলা হয়। তাঁর সদৃশ কোনো কিছুই নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿ لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ ١١﴾ [الشورى: ١١]   “তাঁর সদৃশ কোনো জিনিস নেই, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা”। [সূরা আশ-শুরা, আয়াত: ১১] তিনি আরো বলেন, ﴿وَلِلَّهِ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ فَٱدۡعُوهُ بِهَاۖ ١٨٠﴾ [الاعراف: ١٧٩]   “আল্লাহর অনেক অতি সুন্দর নাম রয়েছে, অতএব সেগুলো দ্বারা তাঁকে ডাকো”। [সূরা আরাফ, আয়াত: ১৮০]
২) তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ: ইবাদতে আল্লাহকে এক জানা। তিনি একক, তার কোন শরীক নেই। এটিই হচ্ছে বান্দার ইবাদতগত কর্মগুলোর মাধ্যমে আল্লাহকে একক করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ وَيُقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَيُؤۡتُواْ ٱلزَّكَوٰةَۚ وَذَٰلِكَ دِينُ ٱلۡقَيِّمَةِ ٥﴾ [البينة: ٥]  “আর তাদেরকে কেবল এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তার জন্য দীনকে (ইবাদতকে) একনিষ্ঠ করে”। [সূরা আল-বায়্যিনাহ: ৫] তিনি আরো বলেন, ﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَا مِن قَبۡلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِيٓ إِلَيۡهِ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱعۡبُدُونِ ٢٥﴾ [الانبياء: ٢٥]   “আর তোমার পূর্বে এমন কোনো রাসূল আমি পাঠাইনি, যার প্রতি আমি এই ওহী নাযিল করিনি যে, আমি ছাড়া আর কোনো সত্য ইলাহ নেই। সুতরাং তোমরা আমার ইবাদত করো”। [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৫] তাওহীদের এ প্রকারভেদ কেবল একটি ইলমী (জ্ঞানগত) বিশ্লেষণ মাত্র। অন্যথায় এগুলো কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী তাওহীদপন্থীর আকীদাহ-বিশ্বাসে একটির সাথে অপরটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে বলা হয়, যেসব অপরাধ দ্বারা আল্লাহর নাফরমানি করা হয় তার মধ্যে সবচেয়ে বড় কোনটি?
উত্তর: বল, সেটি হলো শির্ক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَقَدۡ كَفَرَ ٱلَّذِينَ قَالُوٓاْ إِنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡمَسِيحُ ٱبۡنُ مَرۡيَمَۖ وَقَالَ ٱلۡمَسِيحُ يَٰبَنِيٓ إِسۡرَٰٓءِيلَ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمۡۖ إِنَّهُۥ مَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدۡ حَرَّمَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِ ٱلۡجَنَّةَ وَمَأۡوَىٰهُ ٱلنَّارُۖ وَمَا لِلظَّٰلِمِينَ مِنۡ أَنصَارٖ ٧٢﴾ [المائ‍دة: ٧٢]
   “অবশ্যই তারা কুফরী করেছে, যারা বলেছে, নিশ্চয় আল্লাহ হচ্ছেন মারইয়াম পুত্র মাসীহ। আর মাসীহ বলেছে, হে বনী ইসরাইল, তোমরা আমার রব ও তোমাদের রব আল্লাহর ইবাদত করো। নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শির্ক করে, তার ওপর অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিবেন এবং তার ঠিকানা জাহান্নাম। আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই”। [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়ত: ৭২] তিনি আরো বলেন,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغۡفِرُ أَن يُشۡرَكَ بِهِۦ وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُۚ ٤٨﴾ 
[النساء : ٤٨]
  “নিশ্চয় আল্লাহ তার সাথে শির্ক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪৮] আল্লাহ তা‘আলা শির্ক গুনাহ ক্ষমা না করা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এটি সবচেয়ে বড় গুনাহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী এ কথাকে আরো সুস্পষ্ট করেছে। তাঁকে যখন প্রশ্ন করা হলো, কোন গুনাহ সবচেয়ে বড়? তিনি বললেন, আল্লাহর সমকক্ষ নির্ধারণ করা, অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম) নিদ্দ অর্থ সমকক্ষ ও সদৃশ।

শির্ক হচ্ছে সৃষ্টি থেকে আল্লাহর জন্য কোনো শরীক তথা সমকক্ষ ও সদৃশ নির্ধারণ করা। চাই তা ফিরিশতা হোক, অথবা রাসূল অথবা অলী কিংবা অনুরূপ কেউ হোক। অতঃপর তার মধ্যে রুবুবিয়্যাতের কোনো গুণ অথবা বৈশিষ্ট্য আছে বলে বিশ্বাস করা। যেমন- সৃষ্টি করা অথবা সৃষ্টির কর্তৃত্ব করা অথবা সৃষ্টি-জগতের ব্যবস্থাপনা করা অথবা তার নৈকট্য হাসিল করার জন্য তার কাছে দু‘আ বা আশা করা অথবা তাকে ভয় অথবা তার ওপর ভরসা করা অথবা আল্লাহ ব্যতীত কিংবা আল্লাহ কাছে আশা-আকাঙ্ক্ষা করার পাশাপাশি তার কাছে আশা-আকাঙ্ক্ষা করা। ফলে তার জন্য আর্থিক অথবা প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য শারীরিক ইবাদত পেশ করা।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, শির্কের প্রকারগুলো কী কী?
উত্তর: বল, শির্ক দুই প্রকার:

১) বড় শিরক: এটি হচ্ছে ইবাদাতের প্রকারসমূহ হতে কোন একটি ইবাদত গাইরুল্লাহর জন্য সমর্পণ করা। যেমন গাইরুল্লাহর ওপর ভরসা করা অথবা মৃতদের কাছে মদদ চাওয়া অথবা গাইরুল্লাহর জন্য যবেহ করা অথবা গায়রুল্লাহর জন্য মানত করা, সিজদাহ করা অথবা গায়রুল্লাহর নিকট এমন বিষয়ে ফরিয়াদ করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ ক্ষমতা রাখে না। যেমন অনুপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে অথবা মৃতদের কাছে ফরিয়াদ করা। এ জাতীয় বোকামি তারাই করতে পারে, যারা বিশ্বাস করে যে, উপরোক্ত ব্যক্তিরা তাদের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা রাখে এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ কিছু করার ক্ষমতা রাখে না এমন কাজ করতে পারে। ফলে সে এ দ্বারা ঐ মাখলুকের মধ্যে রুবুবিয়াতের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে বলে বিশ্বাসী হয়ে যায়। এ কারণে সে তার সামনে বিনয়ী হয়, তার জন্য দাসত্বের ন্যায় হীনতা প্রকাশ করে, তার ওপর ভরসা করে, তার নিকট কাকুতি-মিনতি করে, তার নিকট ফরিয়াদ করে এবং তার কাছে এমন কিছু চেয়ে তাকে আহ্বান করে, যা কোনো মাখলুকের পক্ষে দান করা সম্ভব নয়। আজব ব্যাপার হলো, মানুষ এমন অক্ষমের নিকট ফরিয়াদ করে, যে নিজের ক্ষতি কিংবা উপকার করার সামর্থ্য রাখে না এবং জীবন, মৃত্যু ও পুনরুত্থানের মালিক নয়। অতএব যে নিজের ক্ষতি দূর করতে অক্ষম সে কিভাবে অপরের ক্ষতি দূর করবে? এটা তো এক ডুবন্ত ব্যক্তি অপর ডুবন্ত ব্যক্তির নিকট ফরিয়াদ করার মতোই। সুবহানাল্লাহ! কিভাবে কতক মানুষের দৃষ্টিভ্রম ঘটে ও তাদের বিবেক চলে যায়। ফলে শরী‘আত বিধ্বংসী, বিবেক বিরোধী ও বাস্তবতার পরিপন্থী এ জাতীয় শির্কে লিপ্ত হয়!

২) ছোট শির্ক: যেমন সামান্য রিয়া। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমাদের ওপর আমি সবচেয়ে বেশী ভয় করি ছোট শির্কের। তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, তা হলো রিয়া”। (এটি বর্ণনা করেছেন সহীহ মুসলিম) ছোট শির্কের আরো উদাহরণ হলো গায়রুল্লাহর নামে কসম করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে গায়রুল্লাহর নামে কসম করল সে কুফরি করল অথবা র্শিক করল”। (তিরমিযী)

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, কুফরের প্রকারগুলো কী কী?
উত্তর: বল, কুফর দুই প্রকার:

১) বড় কুফর: এটি মানুষকে দীন থেকে বহিষ্কার করে দেয়। এটি মূল দীনের সম্পূর্ণ বিপরীত। যেমন কেউ আল্লাহকে গাল-মন্দ করলো অথবা তার দীন অথবা তার নবী অথবা শরী‘আতকে গাল দিল এবং দীনের কোনো বিষয় নিয়ে উপহাস ও ঠাট্টা করলো। অথবা আল্লাহর ওপর তার কোন সংবাদ অথবা তার আদেশ অথবা তার নিষেধ প্রত্যাখ্যান করলো। ফলে সে আল্লাহ ও তার রাসূল যে সংবাদ দিয়েছেন সেটা অস্বীকার করলো অথবা আল্লাহ তার বান্দাদের ওপর যা ফরয করেছেন তার কোনো একটি বিষয় অস্বীকার করলো অথবা আল্লাহ ও তার রাসূল যা হারাম করেছেন তার কোন একটিকে বৈধ জানলো, প্রভৃতি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “বল, আল্লাহ, তার আয়াতসমূহ ও তার রাসূলের সাথে কি তোমরা বিদ্রূপ করছিলে? তোমরা ওযর পেশ কর না। তোমরা তোমাদের ঈমানের পর অবশ্যই কুফরী করেছ”। [সূরা তাওবাহ, আয়াত: ৬৫-৬৬]
২) ছোট কুফর: এটি হচ্ছে শরী‘আতের দলীল যাকে কুফর বলেছে ঠিকই; কিন্তু বড় কুফর নয়। এটাকে নি‘আমতের কুফরি অথবা ছোট কুফর বলে নামকরণ করা হয়। যেমন মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করা, বংশ থেকে বিচ্ছেদ ঘোষণা করা ও মাতম করা প্রভৃতি জাহেলিয়াতের স্বভাব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মানুষের মধ্যে দু’টি স্বভাব রয়েছে, যা তাদের মধ্যে কুফরী স্বরূপ: বংশে অপবাদ দেওয়া ও মৃত ব্যক্তির ওপর মাতম করা”। হাদীসটি সহীহ মুসলিম বর্ণনা করেছেন। এ কাজগুলা ব্যক্তিকে মিল্লাত থেকে বের করে না। তবে এগুলো কবিরা গুনাহ। এ থেকে আল্লাহর নিকট আমরা আশ্রয় চাই।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, নিফাকের প্রকারগুলো কী কী?
উত্তর: বল, নিফাক দুই প্রকার। বড় নিফাক ও ছোট নিফাক।

বড় নিফাক: তা হলো ঈমান প্রকাশ করা ও কুফর গোপন করা। এটি ইসলাম ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ, তার বিজয়কে অপছন্দ করা ও তার ধারক মুসলিমদের অপছন্দ করা, তাদের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা ও তাদের দীন নষ্ট করার সবচেয়ে বড় আলামত।

ছোট নিফাক: আর এটি হচ্ছে অন্তরে কুফর গোপন করা ছাড়াই মুনাফিকদের আমলের সাদৃশ্য করা। যেমন কথা বলার সময় মিথ্যা বলা, ওয়াদা করে খেলাফ করা ও আমানতের খেয়ানত করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মুনাফিকদের আলামত তিনটি: যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন আমানত রাখা হয় খিয়ানত করে ও যখন ওয়াদা করে ভঙ্গ করে”। (সহীহ বুখারী)

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়,  نواقض الإسلام বা ইসলাম ভঙ্গকারী বিষয়গুলো কী কী?
উত্তর: বল, আরবী শব্দ “الناقض” অর্থ বাতিলকারী ও বিনষ্টকারী। এটি যখন কোনো বস্তুর ওপর আপতিত হয় তখন বস্তুকে ধ্বংস ও বিনষ্ট করে দেয়। যেমন অযু ভঙ্গের কারণসমূহ। যে তা করবে তার অযু বাতিল হয়ে যাবে এবং তাকে পুনরায় অযু করতে হবে। ইসলাম ভঙ্গকারী বস্তুগুলোও অনুরূপ। বান্দা যখন তা করবে, তার ইসলাম ভঙ্গ ও বিনষ্ট হবে এবং সে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে কুফরীতে প্রবেশ করবে। আলেমগণ রিদ্দা ও মুরতাদের হুকুম সম্পর্কিত অধ্যায়ে বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ করেছেন, যেগুলোর কারণে মুসলিম তার দীন থেকে বের হয়ে মুরতাদে হয়ে যায় এবং তার জীবন ও সম্পদ হালাল হয়ে যায়। আলেমগণ যেগুলোর ওপর ঐকমত হয়েছেন এমন ইসলাম ভঙ্গকারী বিষয় দশটি। এগুলো হচ্ছে, ১) আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতে শির্ক করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

 ﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغۡفِرُ أَن يُشۡرَكَ بِهِۦ وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُۚ ١١٦﴾ [النساء : ١١٦]
   “নিশ্চয় আল্লাহ্ তাঁর সাথে অংশীদার করাকে ক্ষমা করেন না এবং এ ছাড়া যাকে চান ক্ষমা করেন”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১১৬] তিনি আরো বলেন, ﴿إِنَّهُۥ مَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدۡ حَرَّمَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِ ٱلۡجَنَّةَ وَمَأۡوَىٰهُ ٱلنَّارُۖ وَمَا لِلظَّٰلِمِينَ مِنۡ أَنصَارٖ ٧٢﴾ [المائ‍دة: ٧٢]  “নি:সন্দেহে যে আল্লাহর সাথে শির্ক করবে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন এবং তার আবাস জাহান্নাম। আর যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই”। [সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৭২] এরূপ আরো কয়েকটি শির্ক হচ্ছে, গায়রুল্লাহকে ডাকা, তাদের নিকট ফরিয়াদ করা ও তাদের আশ্রয় প্রার্থনা করা। অনুরূপভাবে তাদের জন্যে মান্নত ও জবেহ করা। যেমন কেউ কল্যাণ অর্জন কিংবা অকল্যাণ দূর করার জন্য জিন অথবা কবর অথবা জীবিত কিংবা মৃত অলীর জন্য পশু জবেহ করল। যেমন চরম মিথ্যুক গোমরাহদের বানানো মিথ্যা ও সন্দেহপূর্ণ কাজ দ্বারা ধোকাপ্রাপ্ত মূর্খরা করে থাকে।

২) যে তার নিজের ও আল্লাহর মাঝে মধ্যস্থতাকারী নির্ধারণ করে তাদেরকে আহ্বান করে, তাদের নিকট সুপারিশ চায় এবং দুনিয়া ও আখিরাতের উদ্দেশ্য ও আশা হাসিল করার জন্য তাদের ওপর ভরসা করে, সে আলেমদের ঐকমতে কাফির। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿قُلۡ إِنَّمَآ أَدۡعُواْ رَبِّي وَلَآ أُشۡرِكُ بِهِۦٓ أَحَدٗا ٢٠﴾ [الجن: ٢٠]   “বল, আমি তো কেবল আমার রবকেই ডাকি এবং তার সাথে কাউকে শরীক করি না”। [সূরা আল-জিন, আয়াত: ২০]
৩) যে মুশরিকদের কাফির বলে না অথবা তাদের কুফরীতে সন্দেহ করে অথবা তাদের মাযহাবকে শুদ্ধ আখ্যায়িত করে, সে কাফির। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর ইহুদীরা বলে, উযাইর আল্লাহর পুত্র এবং নাসারারা বলে, মাসীহ আল্লাহর পুত্র। এটা তাদের মুখের কথা। তারা সেসব লোকের কথার অনুরূপ বলছে যারা ইতিপূর্বে কুফরি করেছে। আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন, এদেরকে কোথায় ফেরানো হচ্ছে?” [সূরা তাওবা, আয়াত: ৩০] কারণ কুফরির প্রতি সন্তুষ্ট থাকাও কুফরি। ইসলাম ব্যতীত অন্য দীন বাতিল এ কথার বিশ্বাস করার মাধ্যমে তাগুতকে অস্বীকার করা, তাকে ঘৃণা করা, তা ও তার অনুসারীদের থেকে মুক্ত হওয়া এবং সাধ্যানুসারে তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা ব্যতীত দীন সঠিক হয় না।

৪) যে ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ থেকে অপরের আদর্শ পূর্ণতম অথবা তার ফয়সালার চেয়ে অপরের ফয়সালা বেশী সুন্দর বলে বিশ্বাস করে। যেমন কেউ তাগূতদের ফয়সালা ও মানব রচিত আইন-কানুনকে আল্লাহ ও তার রাসূলের ফয়সালার ওপর প্রাধান্য দিলো। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا ٦٥﴾ [النساء : ٦٥]   “অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক মানে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬৫] আর যে পথভ্রষ্ট পীরদের তরীকাসমূহ, তাদের বানানো কুসংস্কার ও বিদআতসমূকে সহীহ সুন্নাতের ওপর প্রাধান্য দেয়। অথচ সে জানে নিশ্চয় এটি নববী সুন্নাত। যে এরূপ করবে সে আলেমদের ঐকমতে কাফির।

৫) যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনিত কোনো বস্তুকে ঘৃণা করল, সে কুফরি করল; যদিও সে তার ওপর আমল করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمۡ كَرِهُواْ مَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأَحۡبَطَ أَعۡمَٰلَهُمۡ ٩ ﴾ [محمد : ٩]
   “তা এ জন্য যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তারা তা অপছন্দ করে। অতএব তিনি তাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করে দিয়েছেন”। [সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ৯]
৬) যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দীনের কোনো বিষয় নিয়ে উপহাস করল, যেমন তার কোনো হুকুম, বিধান, সুন্নত অথবা তার সংবাদসমূহ নিয়ে ঠাট্টা করল অথবা আল্লাহ তা‘আলা আনুগত্য-কারীদের জন্য যে ছওয়াব এবং অবাধ্যদের জন্যে যে শাস্তি প্রস্তুত করেছেন, সে বিষয়ে আল্লাহ ও তার রাসূল যে সংবাদ দিয়েছেন তা নিয়ে উপহাস করল, সে কুফরি করল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, قُلْ أَبِاللّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِؤُونَ لاَ تَعْتَذِرُواْ قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ “বল, আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তার রাসূলের সাথে কি তোমরা বিদ্রূপ করছিলে? তোমরা ওযর পেশ কর না। তোমরা ঈমানের পর কুফরি করেছ”। [সূরা তাওবা, আয়াত: ৬৫-৬৬]
৭) যাদু করা। এটি জিন ও শয়তানকে ব্যবহার এবং তাদেরকে আল্লাহর সাথে শরীক করা ও তাদের সন্তুষ্টি অর্জনে কুফরি কাজ করা ছাড়া সম্পন্ন হয় না। মানুষের আবেগ-অনুভূতিতে প্রভাব বিস্তারকারী সারফ ও আতফ (স্বামী থেকে স্ত্রীকে ফিরানো ও স্ত্রীর ওপর স্বামীকে আসক্ত করার মন্ত্র) যাদুর অন্তর্ভুক্ত। এ কাজ যে করল অথবা তাতে রাজি হল সে কুফরি করল। প্রমাণ আল্লাহর বাণী: ﴿وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنۡ أَحَدٍ حَتَّىٰ يَقُولَآ إِنَّمَا نَحۡنُ فِتۡنَةٞ فَلَا تَكۡفُرۡۖ ١٠٢﴾ [البقرة: ١٠٢]  “আর তারা কাউকে শেখাত না যে পর্যন্ত না বলত যে, আমরা তো পরীক্ষা। সুতরাং তোমরা কুফরি করো না”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১০২]
৮) মুসলিমদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের পক্ষপাতিত্ব এবং তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা কুফরি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَتَّخِذُواْ ٱلۡيَهُودَ وَٱلنَّصَٰرَىٰٓ أَوۡلِيَآءَۘ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٖۚ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمۡ فَإِنَّهُۥ مِنۡهُمۡۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلظَّٰلِمِينَ ٥١﴾ [المائ‍دة: ٥١]
  “আর তোমাদের থেকে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। নিশ্চয় আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হিদায়েত করেন না”। [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৫১]
৯) যে বিশ্বাস করে যে, কতক লোকের জন্য মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শরীয়তের বাইরে থাকার সুযোগ আছে, যেমন খিযির আলাইহিস সালামের জন্য মূসা আলাইহিস সালামের শরীআতের বাইরে থাকার সুযোগ ছিল, সে কাফির। কারণ আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿وَمَن يَبۡتَغِ غَيۡرَ ٱلۡإِسۡلَٰمِ دِينٗا فَلَن يُقۡبَلَ مِنۡهُ وَهُوَ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ ٨٥﴾ [ال عمران: ٨٥] 

“যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্ম গ্রহণ করবে তার কোনো আমল গ্রহণ করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে”। [সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ৮৫]
১০) আল্লাহর দীন থেকে বিমুখ হওয়া; তা শেখে না ও সে অনুযায়ী আমল করে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَنۡ أَظۡلَمُ مِمَّن ذُكِّرَ بِ‍َٔايَٰتِ رَبِّهِۦ ثُمَّ أَعۡرَضَ عَنۡهَآۚ إِنَّا مِنَ ٱلۡمُجۡرِمِينَ مُنتَقِمُونَ ٢٢﴾ [السجدة : ٢٢] 

“যে ব্যক্তিকে আল্লাহর আয়াতসমূহ দ্বারা উপদেশ প্রদান করা হয়, অতঃপর সে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার চেয়ে যালিম আর কে হতে পারে? নিশ্চয় আমি অপরাধীদেরকে শাস্তি দেব”। [সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত: ২২] এখানে আল্লাহর দীন থেকে বিমুখ হওয়া অর্থ হচ্ছে, দীনের আবশ্যিক বিষয়গুলো না শেখা, যে গুলো দীনের মূলনীতি হওয়ায় সেগুলো সম্পর্কে জানা ছাড়া দীন বিশুদ্ধ হয় না।

ইসলাম ভঙ্গের কারণগুলো উল্লেখ করার পর দু’টি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবাণীর আলোচনা করা ভালো মনে করছি।

১) ইসলাম ভঙ্গকারী এসব বস্তু উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো তা থেকে সতর্ক থাকা ও মানুষকে সাবধান করা। কারণ, শয়তান ও তার পথভ্রষ্ট, বিকারগ্রস্ত সাঙ্গ-পাঙ্গরা মুসলিমদের ক্ষতি করার অপেক্ষায় থাকে। ফলে তারা তাদের কতকের অসতর্কতা ও মূর্খতাকে হকের গণ্ডি থেকে বের করে বাতিলের দিকে এবং জান্নাতের পথ থেকে বিচ্যুত করে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ মনে করে।

২) ইসলাম ভঙ্গকারী এসব বিষয়াবলী বাস্তবতার ওপর প্রয়োগ করা বিজ্ঞ আলেমদের কাজ। কেননা তারাই মানুষের ওপর বিধান আরোপ করার জন্য দলীল-প্রমাণসমূহ, হুকুম-আহকাম ও নীতিমালাসমূহ জানেন। এটা প্রত্যেকের জন্যে বৈধ নয়।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, কোনো মুসলিমের উপর কি জান্নাত অথবা জাহান্নামের হুকুম আরোপ করা যাবে?

উত্তর: বল, যাদের জান্নাতী কিংবা জাহান্নামী হওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট দলীল রয়েছে, তাদের ব্যতীত অন্য কারো উপর জান্নাত বা জাহান্নামের হুকুম প্রয়োগ করা অবৈধ। তবে ভালো ব্যক্তির জন্য ছওয়াব আশা করা ও খারাপ ব্যক্তির ওপর শাস্তির আশঙ্কা করা যায়। আমরা বলি, যে কেউ ঈমানের ওপর মারা যাবে তার গন্তব্য-স্থল জান্নাত এবং যার মৃত্যু হবে শির্ক ও কুফরির ওপর তার ঠিকানা জাহান্নাম। এটি খুব খারাপ বাসস্থান।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, পাপের কারণে মুসলিমের ওপর কুফরির ফয়সালা করা যাবে কি?
উত্তর: বলা হলো, পাপ ও গুনাহে লিপ্ত হওয়ার কারণে কোনো মুসলিমের ওপর কাফির ফয়সালা দেওয়া যাবে না। যদিও সেটি কবীরা গুনা হয়। যতক্ষণ না সেটি কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত শর‘য়ী দলীলসমূহে তা কাফিরে পরিণত-কারী না হয় এবং সাহাবী ও ইমামগণ তা না বলে। আর সে ঈমানের ওপর বহাল থাকবে, তবে যতক্ষণ না সে বড় কুফর অথবা বড় শির্ক অথবা বড় নিফাকীতে লিপ্ত না হয় সে তাওহীদ পন্থী পাপীদের থেকে হবে।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, জিহ্বার বিচ্যুতি ও খারাপ বাক্য কি তাওহীদ নষ্ট করে ফেলে এবং যে তা বলে সে কি সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়, না সেটি শুধু ছোট গুনাহ?
উত্তর: জিহ্বার বিষয়টি মহান। একটি বাক্য দ্বারা মানুষ ইসলামে প্রবেশ করে এবং একটি বাক্য দ্বারাই ইসলাম থেকে বের হয়। এ থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই। জিহ্বার বিচ্যুতি ও পদস্খলন বিভিন্ন প্রকার। (ক) এর মধ্যে রয়েছে এমন কুফরি বাক্য, যা ঈমান বিনষ্ট করে ফেলে ও আমল ধ্বংস করে দেয়। যেমন, আল্লাহ বা তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গাল-মন্দ করা অথবা মহান নেতা ও অলীদের রুবুবিয়্যাতের গুণে গুণান্বিত করা, তাদের কাছে ফরিয়াদ করা এবং তাদের প্রতি কল্যাণ ও মানুষের যা হাসিল হয় তা সম্বন্ধ করা। (খ) তাদের প্রশংসায় সীমালঙ্ঘনকারী শব্দ প্রয়োগ করা, তাদেরকে মানবীয় বৈশিষ্ট্যের ঊর্ধ্বে তুলে ধরা, তাদের নামে কসম করা অথবা শরীয়ত ও তার বিধান নিয়ে উপহাস ও ঠাট্টা করা। (গ) আল্লাহর শরীয়তের হুকুম-আহকামের প্রতি অসন্তুষ্টির বাক্য উচ্চারণ করা অথবা দুনিয়াতে তাকদীরের নির্ধারণ অনুযায়ী জান-মাল, সন্তান ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে মসীবত আসে তার ওপর প্রশ্ন এবং আপত্তি উত্থাপন করা।

এমন কিছু কবিরা গুনাহ আছে, যা ঈমানের ক্ষতি করে এবং তা ও হ্রাস করে। তার মধ্যে গীবত ও চোগলখুরী অন্যতম। অতএব আল্লাহর শরীয়ত ও তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত পরিপন্থী প্রত্যেক শব্দ থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা চাই এবং তা থেকে আমাদের জবান হিফাজত করা আবশ্যক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধায়ক এমন কথা বলে, যার প্রতি সে বিশেষ গুরুত্বারোপ করে না, কিন্তু আল্লাহ তাকে তা দ্বারা অনেক উচ্চে আসীন করেন। অনুরূপ বান্দা আল্লাহর ক্রোধ উদ্রেককারী এমন কথা বলে ফেলে, যার প্রতি সে বিশেষ গুরুত্বারোপ করে না, কিন্তু তার কারণে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়”। [সহীহ বুখারী]
প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, মুমিনের আমল কখন শেষ হয়?
উত্তর: বল, মৃত্যু ব্যতীত মুমিনের আমল শেষ হয় না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন ﴿وَٱعۡبُدۡ رَبَّكَ حَتَّىٰ يَأۡتِيَكَ ٱلۡيَقِينُ ٩٩﴾ [الحجر: ٩٩]   “আর ইয়াকীন আসা পর্যন্ত তুমি তোমার রবের ইবাদত কর”। [সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৯৯] এখানে ইয়াকীন অর্থ মৃত্যু। এ কথার দলীল হলো উসমান বিন মাযউন যখন মারা গেলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আল্লাহর কসম উসমানের নিকট ইয়াকীন এসে গেছে”। [সহীহ বুখারী] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জীবদ্দশায় আমল ত্যাগ করেননি। এখানে ইয়াকীন অর্থ ঈমানের এমন স্তর নয়, যেখানে পৌঁছালে মুমিন আমল ছেড়ে দিবে অথবা তার ওপর থেকে আমল করার হুকুম ওঠে যায়। যেমন কতিপয় বিভ্রান্ত লোকেরা তা ধারণা করে।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আসমান ও যমীন এবং তাদের মধ্যবর্তী সবকিছু কে পরিচালনা করেন?
উত্তর: বল, যিনি আসমান, যমীন ও তাদের মধ্যবর্তী সবকিছু পরিচালনা করেন তিনি হলেন এক আল্লাহ। তার কোনো শরীক নেই। তিনি ব্যতীত কোনো মালিক নেই। তার কোনো শরীক নেই এবং কোনো সাহায্যকারী-সহযোগিতা-কারী নেই। তিনি পবিত্র ও প্রশংসার যোগ্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلِ ٱدۡعُواْ ٱلَّذِينَ زَعَمۡتُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ لَا يَمۡلِكُونَ مِثۡقَالَ ذَرَّةٖ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَلَا فِي ٱلۡأَرۡضِ وَمَا لَهُمۡ فِيهِمَا مِن شِرۡكٖ وَمَا لَهُۥ مِنۡهُم مِّن ظَهِيرٖ ٢٢﴾ [سبا: ٢٢] 

“বল, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ইলাহ মনে করতে তাদেরকে আহ্বান করো। তারা আসমানসমূহ ও জমিনের মধ্যে অণু পরিমাণ কিছুর মালিক নয়। আর এ দু’য়ের মধ্যে তাদের কোনো অংশীদারিত্ব নেই এবং তাদের মধ্য থেকে কেউ তার সাহায্যকারীও নয়”। [সূরা সাবা, আয়াত: ২২]
প্রশ্ন: যখন তোমাকে বলা হয়, যে বিশ্বাস করে, চারজন অথবা সাতজন কুতুব আসমান ও যমীন পরিচালনা  করে, অথবা  অনেক আওতাত ও গাউস আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অথবা আল্লাহর সাথে তাদেরও শরণাপন্ন হওয়া যায়, তার হুকুম কী?
উত্তর: বল, এরূপ বিশ্বাস যে করবে তার কুফরির ব্যাপারে সকল আলেম একমত। কারণ সে আল্লাহর রবুবিয়্যাতে অংশীদার আছে বলে বিশ্বাস করলো।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, অলীগণ কি গায়েব জানে এবং তারা  কি মৃতদের জীবিত করতে পারে?
উত্তর: বল, আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ গায়েব জানে না এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ মৃতদের জীবিত করতে পারে না। দলীল হলো, আল্লাহ তাআলার বাণী:

﴿وَلَوۡ كُنتُ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ لَٱسۡتَكۡثَرۡتُ مِنَ ٱلۡخَيۡرِ وَمَا مَسَّنِيَ ٱلسُّوٓءُۚ ١٨٨﴾ [الاعراف: ١٨٧] 

“আর আমি যদি গায়েব জানতাম তাহলে অধিক কল্যাণ লাভ করতাম এবং আমাকে কোনো ক্ষতি স্পর্শ করত না”। [সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ১৮৮] অতএব সর্বোত্তম মাখলুক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন গায়েব জানেন না, তিনি ছাড়া অন্য কেউ গায়েব না জানা অধিক উত্তম ও শ্রেয়।

চার ইমাম একমত যে, যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গায়েব জানতেন অথবা মৃতদের জীবিত করতেন, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে মুরতাদ হয়ে গেল। কারণ, সে আল্লাহকে মিথ্যুক সাব্যস্ত করল, যিনি স্বীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিন ও মানুষের জন্য এ ঘোষণা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন,

 ﴿قُل لَّآ أَقُولُ لَكُمۡ عِندِي خَزَآئِنُ ٱللَّهِ وَلَآ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ وَلَآ أَقُولُ لَكُمۡ إِنِّي مَلَكٌۖ إِنۡ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَىٰٓ إِلَيَّۚ قُلۡ هَلۡ يَسۡتَوِي ٱلۡأَعۡمَىٰ وَٱلۡبَصِيرُۚ أَفَلَا تَتَفَكَّرُونَ ٥٠﴾ [الانعام: ٥٠]
  “বল, আমি তোমাদেরকে বলি না, আমার নিকট আল্লাহর ভাণ্ডারসমূহ রয়েছে। আর আমি গায়েবও জানি না। আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমি ফিরিশতা। আমার নিকট যা অহী করা হয় তা ব্যতীত আমি অন্য কিছুর অনুসরণ করি না”। [সূরা আল-আনআম, আয়াত: ৫০] তিনি আরো বলেন,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ عِندَهُۥ عِلۡمُ ٱلسَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ ٱلۡغَيۡثَ وَيَعۡلَمُ مَا فِي ٱلۡأَرۡحَامِۖ وَمَا تَدۡرِي نَفۡسٞ مَّاذَا تَكۡسِبُ غَدٗاۖ وَمَا تَدۡرِي نَفۡسُۢ بِأَيِّ أَرۡضٖ تَمُوتُۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرُۢ ٣٤﴾ [لقمان: ٣٤] 

 “নিশ্চয় আল্লাহর নিকট কিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। আর তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং জরায়ূতে যা আছে, তা তিনি জানেন। আর কেউ জানে না আগামীকাল সে কী উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন স্থানে সে মারা যাবে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত”। [সূরা লুকমান, আয়াত: ৩৪] অতএব আল্লাহ তা‘আলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট যা অহী করেছেন ও তিনি তাকে যা শিখিয়েছেন তা ছাড়া তিনি গায়েব জানেন না। অনুরূপ তিনি কখনো এ দাবি করেন নি যে, তাঁর যেসব সাহাবী অথবা তাঁর যেসব সন্তান ইতিপূর্বে মারা গেছেন, তাদের কাউকে জীবিত করেছেন। অতএব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া অন্যদের পক্ষে কিভাবে গায়েব জানা সম্ভব?

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, বেলায়েত কি কতক মুমিন ছাড়া কতক মুমিনের জন্য নির্দিষ্ট?
উত্তর: বল, যে কেউ মুমিন মুত্তাকী হবে সেই আল্লাহর অলী। দলীল, আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿أَلَآ إِنَّ أَوۡلِيَآءَ ٱللَّهِ لَا خَوۡفٌ عَلَيۡهِمۡ وَلَا هُمۡ يَحۡزَنُونَ ٦٢ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَكَانُواْ يَتَّقُونَ ٦٣﴾ [يونس : ٦٢،  ٦٣]
 “শুনে রেখ, নিশ্চয় আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই, আর তারা পেরেশানও হবে না। যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করত”। [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৬২-৬৩] বেলায়েত কাউকে বাদ দিয়ে অন্য কারো জন্য খাস নয়, তবে তার স্তরগুলো বিভিন্ন। তাকওয়া অর্থ হলো আল্লাহ ও তার রাসূলের আদেশ মানা এবং আল্লাহ ও তার রাসূল যার থেকে নিষেধ করেছেন সেগুলো পরিত্যাগ করা। ঈমান ও আনুগত্য অনুপাতে প্রত্যেক মুমিনের জন্যই বিলায়েত রয়েছে।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আল্লাহ তাআলার বাণী: أَلَآ إِنَّ أَوۡلِيَآءَ ٱللَّهِ لَا خَوۡفٌ عَلَيۡهِمۡ وَلَا هُمۡ يَحۡزَنُونَ “শুনে রেখ, নিশ্চয় আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না” এটি কি অলীদের আহ্বান করাকে বৈধতা দেয়?
উত্তর: বল, আয়াতটি তাদেরকে ডাকা অথবা তাদের কাছে ফরিয়াদ ও আশ্রয় প্রার্থনাকে বৈধ করে না; বরং এতে রয়েছে তাদের স্তরের বর্ণনা এবং তাদের ওপর দুনিয়া ও আখিরাতে ভয় না হওয়ার ঘোষণা। পরকালে তারা চিন্তিতও হবে না। এতে সু সংবাদ লাভের জন্য আল্লাহর তাওহীদ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য করার মাধ্যমে বেলায়েতের গুণাবলী অর্জন করার আহ্বান করা হয়েছে। তিনি বলেন, أَلَآ إِنَّ أَوۡلِيَآءَ ٱللَّهِ لَا خَوۡفٌ عَلَيۡهِمۡ وَلَا هُمۡ يَحۡزَنُونَ “তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা পেরশানও হবে না”। আর গায়রুল্লাহকে ডাকা শির্ক। যেমন পূর্বে তার আলোচনা অতিবাহিত হয়েছে।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, নবীগণ ব্যতীত অলীরা কি কবিরা ও সগীরা গুনাহ থেকে নিষ্পাপ?
উত্তর: বল, নবীগণ ব্যতীত অলীরা সগীরা ও কবীরা গুনাহে লিপ্ত হওয়া থেকে নিষ্পাপ নন। বরং একাধিক বড় অলীগণ ও সালেহীনগণের বিভিন্ন পদস্খলন, বিচ্যুতি ও ভুল-ভ্রান্তি সংঘটিত হয়েছে। তবে তারা খুব দ্রুত তাওবা করেন এবং আল্লাহ-মুখী হয়ে যান। ফলে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেন।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, খিযির আলাইহিস সালাম কি এখনো জীবিত?
উত্তর: বল, বিশুদ্ধ মতে খিযির আলাইহিস সালাম একজন নবী ছিলেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের পূর্বেই তিনি মারা গেছেন। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَا جَعَلۡنَا لِبَشَرٖ مِّن قَبۡلِكَ ٱلۡخُلۡدَۖ أَفَإِيْن مِّتَّ فَهُمُ ٱلۡخَٰلِدُونَ ٣٤﴾ [الانبياء: ٣٤] 

“আমি আপনার পূর্বে কাউকে চিরস্থায়ী করিনি, আপনি যদি মারা যান তারা কি স্থায়ী হবে”? [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৩৪] যদি তিনি জীবিত থাকতেন অবশ্যই আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করতেন এবং তার সাথে যুদ্ধে শরীক হতেন। কেননা, আমাদের নবীকে মানব ও জিন উভয় জাতির নিকট প্রেরণ করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلۡ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنِّي رَسُولُ ٱللَّهِ إِلَيۡكُمۡ جَمِيعًا ١٥٨﴾ [الاعراف: ١٥٧] 

“বল, হে লোক সকল, আমি তোমাদের সকলের নিকট আল্লাহর রাসূল”। [সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ১৫৮] । অনুরূপ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “এ রাত সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি? আজ পৃথিবীতে যারা জীবিত আছে, একশ বছরের মাথায় তাদের কেউ জীবিত থাকবে না”। (সহীহ বুখারী) এ হাদীসটি দলীল যে, খিযির মৃতদের অন্তর্ভুক্ত। অতএব যে তাকে ডাকে তিনি তার ডাক শুনেন না। অনুরূপ রাস্তা হারিয়ে যে তার কাছে পথের সন্ধান চায়, তিনি তাকে রাস্তা দেখান না। আর কতক মানুষের সাথে তার সাক্ষাতের সংবাদ, তাকে দেখা ও তার সাথে উঠবস করার ঘটনাসমূহ এবং তার কাছ থেকে ইলম অর্জন করা বিষয়ক আলোচনা ধারণা প্রসূত ও সুস্পষ্ট মিথ্যা ব্যতীত অন্য কিছু নয়। আল্লাহ যাকে ইলম, বিবেক-বুদ্ধি ও দূরদর্শিতা দিয়েছেন, তার ওপর তা কোন প্রভাব ফেলবে না।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, যারা মৃতদের ডাকে মৃতরা কি তাদের ডাক শোনে ও উত্তর দেয়?
উত্তর: বল, মৃতরা শোনে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَمَآ أَنتَ بِمُسۡمِعٖ مَّن فِي ٱلۡقُبُورِ ٢٢ ﴾ [فاطر: ٢٢]
 “যে কবরে রয়েছে আপনি তাকে শোনাতে পারবেন না”। [সূরা ফাতির, আয়াত: ২২] তিনি আরো বলেন, “আপনি মৃতকে শুনাতে পারবেন না”। [সূরা আন-নামল, আয়াত: ৮০] যে তাদেরকে ডাকে তার ডাকে তারা সাড়া দেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন ﴿ وَٱلَّذِينَ تَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ مَا يَمۡلِكُونَ مِن قِطۡمِيرٍ ١٣ إِن تَدۡعُوهُمۡ لَا يَسۡمَعُواْ دُعَآءَكُمۡ وَلَوۡ سَمِعُواْ مَا ٱسۡتَجَابُواْ لَكُمۡۖ وَيَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ يَكۡفُرُونَ بِشِرۡكِكُمۡۚ وَلَا يُنَبِّئُكَ مِثۡلُ خَبِيرٖ ١٤ ﴾ [فاطر: ١٣،  ١٤]     “আর আল্লাহকে ছাড়া যাদেরকে তোমরা ডাকো তারা খেজুরের আঁটির আবরণেরও মালিক নয়। যদি তোমরা তাদেরকে ডাক, তারা তোমাদের ডাক শুনবে না আর শুনতে পেলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেবে না এবং কিয়ামতের দিন তারা তোমাদের শির্ক করাকে অস্বীকার করবে। আর সর্বজ্ঞ আল্লাহর ন্যায় কেউ তোমাকে অবহিত করবে না”। [সূরা ফাতির, আয়াত: ১৩-১৪] আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿ وَمَنۡ أَضَلُّ مِمَّن يَدۡعُواْ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَن لَّا يَسۡتَجِيبُ لَهُۥٓ إِلَىٰ يَوۡمِ ٱلۡقِيَٰمَةِ وَهُمۡ عَن دُعَآئِهِمۡ غَٰفِلُونَ ٥ ﴾ [الاحقاف: ٥]  “তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কাউকে ডাকে, যে কিয়ামত দিবস পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবে না? আর তারা তাদের আহ্বান সম্পর্কে উদাসীন”। [সূরা আল-আহকাফ, আয়াত: ৫]
প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, মূর্খরা যেসব মৃতকে সম্মান করে তাদের কতকের কবরের পাশে কখনো কখনো এসব কি শুনা যায়?
উত্তর: বল, এ সব হলো শয়তান জিনদের আওয়াজ। তারা মূর্খদের ধারণা দেয় যে, এটা হচ্ছে কবরস্থ ব্যক্তির শব্দ। যাতে এরা তাদেরকে ফেতনায় ফেলতে পারে এবং তাদের ওপর তাদের দীনকে সন্দেহযুক্ত করে তুলে এবং তাদের গোমরাহ করে। কুরআনের সুস্পষ্ট দলীল দ্বারা প্রমাণিত যে, যারা কবরবাসীদের ডাকে ও আহ্বান করে, তারা তাদের ডাক ও আহ্বান শোনে না এবং উত্তর দেয় না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আপনি মৃতদের শুনাতে পারবেন না”। [সূরা নামাল, আয়াত: ৮০] তিনি আরো বলেন, ﴿ إِن تَدۡعُوهُمۡ لَا يَسۡمَعُواْ دُعَآءَكُمۡ ٖ ١٤ ﴾ [فاطر: ١٤]    “যদি তোমরা তাদেরকে ডাক তারা তোমাদের ডাক শুনবে না”। [সূরা ফাতির, আয়াত: ১৪] তিনি আরো বলেন,  ﴿وَمَآ أَنتَ بِمُسۡمِعٖ مَّن فِي ٱلۡقُبُورِ ٢٢ ﴾ [فاطر: ٢٢] “যারা কবরে আছে আপনি তাদেরকে শুনাতে পারবেন না”। [সূরা ফাতির আয়াত: ২২] তারা কিভাবে সাড়া দেবে? অথচ তারা বারযাখী জগতে রয়েছে। দুনিয়ার লোকদের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَهُمۡ عَن دُعَآئِهِمۡ غَٰفِلُونَ ٥﴾ [الاحقاف: ٥] 

“অথচ তাদের দুআ থেকে তারা উদাসীন”। [সূরা আহকাফ, আয়াত: ৫]
প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, মৃত আলী এবং অন্যদের কাছে যারা ফরিয়াদ করে ও তাদের কাছে মদদ চায় তারা কি তাদের ডাকে সাড়া দেয়?
উত্তর: বল, যারা তাদেরকে ডাকে তারা তাদের ডাকে সাড়া দেয় না এবং যারা তাদের ডাকে অথবা তাদের কাছে ফরিয়াদ করে, তারা তাদের ডাকে সাড়া দিতে সক্ষম নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَٱلَّذِينَ تَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ مَا يَمۡلِكُونَ مِن قِطۡمِيرٍ ١٣ إِن تَدۡعُوهُمۡ لَا يَسۡمَعُواْ دُعَآءَكُمۡ وَلَوۡ سَمِعُواْ مَا ٱسۡتَجَابُواْ لَكُمۡۖ وَيَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ يَكۡفُرُونَ بِشِرۡكِكُمۡۚ وَلَا يُنَبِّئُكَ مِثۡلُ خَبِيرٖ ١٤﴾ [فاطر: ١٣،  ١٤] 

 “আর আল্লাহকে ছাড়া যাদেরকে তোমরা ডাকো তারা খেজুরের আঁটির আবরণেরও মালিক নয়। তোমরা যদি তাদেরকে ডাকো, তারা তোমাদের ডাক শুনবে না আর শুনতে পেলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেবে না এবং কিয়ামতের দিন তারা তোমাদের শরীক করাকে অস্বীকার করবে”। [সূরা ফাতির, আয়াত: ১৩-১৪] সে বড়ই হতভাগা, যাকে শয়তান ও পথভ্রষ্টরা ধোঁকা দিয়ে মৃত ও কবরস্থ নবী, অলী ও নেককার লোকদের আহ্বান করাকে সুশোভিত করে দেখিয়েছে! আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَنۡ أَضَلُّ مِمَّن يَدۡعُواْ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَن لَّا يَسۡتَجِيبُ لَهُۥٓ إِلَىٰ يَوۡمِ ٱلۡقِيَٰمَةِ وَهُمۡ عَن دُعَآئِهِمۡ غَٰفِلُونَ ٥ ﴾ [الاحقاف: ٥]
“তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কাউকে ডাকে, যে কিয়ামত দিবস পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবে না? আর তারা তাদের ডাক সম্পর্কে উদাসীন”। [সূরা আল-আহকাফ, আয়াত: ৫]
প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয় আল্লাহর বাণী: ﴿ وَلَا تَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ قُتِلُواْ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ أَمۡوَٰتَۢاۚ بَلۡ أَحۡيَآءٌ عِندَ رَبِّهِمۡ   يُرۡزَقُونَ ١٦٩ ﴾ [ال عمران: ١٦٩]    “আর যারা আল্লাহর পথে জীবন দিয়েছে, তাদেরকে তুমি মৃত মনে করো না; বরং তারা তাদের রবের নিকট জীবিত, তারা তাদের রবের নিকট রিযক প্রাপ্ত হয়”। [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৬৯] এ আয়াতে ‘জীবিত’ শব্দের অর্থ কি?
উত্তর: বল, এ আয়াতে জীবিত অর্থ হলো, তাদের বারযাখী নি‘আমাতের জীবনে জীবিত করা হয়, যা দুনিয়ার জীবনের মতো নয়। কারণ, শহীদদের রূহসমূহ জান্নাতে নি‘আমত প্রাপ্ত হয়। এ জন্যেই আল্লাহ তা‘আলা বলেন “তারা তাদের রবের নিকট রিযিকপ্রাপ্ত হয়”। তারা অন্য জগতে রয়েছেন। তাদের রয়েছে জীবন ও অবস্থাসমূহ তা তাদের দুনিয়ার জীবনের হায়াত ও অবস্থাসমূহের মতো নয়। কারণ, যারা তাদেরকে ডাকে তারা তাদের ডাক শুনে না এবং তাদের ডাকে সাড়া দেয় না। যেমন পূর্বে একাধিক আয়াতে গত হয়েছে। অতএব সেগুলোর মাঝে এবং আয়তের মাঝে কোনো বিরোধ নেই। এ জন্যই আয়াতে “রিযিকপ্রাপ্ত হয়” এসেছে “তারা রিজিক দেয়” আসেনি।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, গায়রুল্লাহের নামে যবেহ করে তার নৈকট্য লাভ করার হুকুম কী?
উত্তর: বল, বড় শির্ক। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَٱنۡحَرۡ ٢ ﴾ [الكوثر: ٢]   “তোমার রবের জন্য সালাত আদায় করো ও কুরবানি কর”। [সূরা কাউসার, আয়াত: ২] তিনি আরও বলেন,﴿قُلۡ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحۡيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ١٦٢ لَا شَرِيكَ لَهُۥۖ وَبِذَٰلِكَ أُمِرۡتُ وَأَنَا۠ أَوَّلُ ٱلۡمُسۡلِمِينَ ١٦٣﴾ [الانعام: ١٦٢،  ١٦٣]   “বল আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সমগ্র সৃষ্টি জগতের রব আল্লাহর জন্যে। তার কোনো শরীক নেই এবং আমাকে এরই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আর আমি মুসলিমদের মধ্যে প্রথম”। [সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১৬২-১৬৩] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে গায়রুল্লাহের জন্য যবেহ করল তার ওপর আল্লাহর লা্আনত”। (সহীহ মুসলিম)

আর নীতিমালা বলে, “যা আল্লাহর জন্যে করা ইবাদত তা অন্যের জন্য করা শির্ক”।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয় গায়রুল্লাহ এর জন্য মানত করার হুকুম কী?
উত্তর: বল, আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য মানত করা বড় শির্ক। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে আল্লাহর আনুগত্য করার মানত করেছে সে তার আনুগত্য করুক। আর যে আল্লাহর নাফরমানি করার মান্নত করেছে সে তাঁর নাফরমানি না করুক”। (সহীহ বুখারী) সুতরাং মান্নত-কারীর অবস্থা অনুযায়ী মানত মৌখিক, আর্থিক অথবা শারীরিক ইবাদত। প্রিয় বস্তু হাসিল করা অথবা অনিষ্ট দূর করার আশায় অথবা প্রাপ্ত নিআমতের শোকর অথবা মুসিবত দূর হওয়ার কৃতজ্ঞতা স্বরূপ শরীয়তের দৃষ্টিতে যা ওয়াজিব নয় তা নিজের ওপর ওয়াজিব করে নেয়াকে মানত বলা হয়। এগুলো ইবাদতের মধ্যে গণ্য, যা গায়রুল্লাহর জন্য সম্পন্ন করা বৈধ নয়। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা মান্নত পূরণকারীদের প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿ يُوفُونَ بِٱلنَّذۡرِ وَيَخَافُونَ يَوۡمٗا كَانَ شَرُّهُۥ مُسۡتَطِيرٗا ٧ ﴾ [الانسان: ٧]   “তারা মানত পূর্ণ করে এবং সে দিনকে ভয় করে যার অকল্যাণ হবে সুবিস্তৃত”। [সূরা আল-ইনসান, আয়াত: ৭]
মূলনীতি হলো, আল্লাহ তা‘আলা যে কাজের কর্তার প্রশংসা করেছেন সে কাজটি ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। আর যা ইবাদত তা আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য করা শির্ক।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আমরা কি আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে আশ্রয় চাইব?
উত্তর: বল, আশ্রয় প্রার্থনা তিনটি প্রকার জানার মাধ্যমে উত্তরটি সুস্পষ্ট হবে। আর তা হচ্ছে:

১) তাওহীদ ও ইবাদত আশ্রয় প্রার্থনা: আর এটি হচ্ছে আপনি যেসব বস্তুকে ভয় করেন তা থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿ قُلۡ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلۡفَلَقِ ١ مِن شَرِّ مَا خَلَقَ ٢ ﴾ [الفلق: ١،  ٢]   “বল, আমি আশ্রয় চাই প্রত্যুষের প্রভুর কাছে। তাঁর সৃষ্টির অকল্যাণ থেকে। [সূরা আল-ফালাক, আয়াত: ১-২] আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿ قُلۡ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلنَّاسِ ١ مَلِكِ ٱلنَّاسِ ٢ إِلَٰهِ ٱلنَّاسِ ٣ مِن شَرِّ ٱلۡوَسۡوَاسِ ٱلۡخَنَّاسِ ٤ ﴾ [الناس: ١،  ٤]   বল, আমি আশ্রয় চাই মানুষের রব, মানুষের অধিপতি এবং মানুষের ইলাহ এর কাছে। আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে”। [সূরা আন-নাস, আয়াত: ১-৪]
২) বৈধ আশ্রয় প্রার্থনা: আর এটি হচ্ছে জীবিত উপস্থিত ব্যক্তির নিকট এমন বিষয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করা, যে ব্যাপারে সে আশ্রয় দিতে সক্ষম এবং যেটি শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্ভব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “যে ব্যক্তি নিরাপদ স্থান ও আশ্রয়স্থল পায় সে যেন সেটি গ্রহণ করে”। (সহীহ মুসলিম)

৩) শির্কী আশ্রয় প্রার্থনা: আর এটি হচ্ছে মাখলুকের নিকট এমন বিষয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করা যে ব্যাপারে সে সক্ষম নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿ وَأَنَّهُۥ كَانَ رِجَالٞ مِّنَ ٱلۡإِنسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٖ مِّنَ ٱلۡجِنِّ فَزَادُوهُمۡ رَهَقٗا ٦ ﴾ [الجن: ٦]   “আর নিশ্চয় কতিপয় মানুষ জিনের আশ্রয় নিতো। ফলে তারা তাদের অহংকার আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল”। [সূরা আল-জিন, আয়াত: ৬]
প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, যখন তুমি কোন স্থানে অবতরণ করবে তখন কি বলবে?
উত্তর: বল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে যা বলতে নির্দেশনা দিয়েছেন তাই বলবো। তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি কোনো স্থানে অবতরণ করে বলবে, ‘আল্লাহর পরিপূর্ণ বাক্য দ্বারা তাঁর মাখলুকের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই, সেই স্থান ত্যাগ করার পূর্ব পর্যন্ত কোনো কিছুই তার ক্ষতি করতে পারবে না। (সহীহ মুসলিম)

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, যে ব্যাপারে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ ক্ষমতাবান নয়, সে ব্যাপারে কল্যাণ অর্জন অথবা অনিষ্ট দূর করার জন্য কি গায়রুল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করা যায়?
উত্তর: বল, এটা এমন বড় শির্ক, যা আমলসমূহ বিনষ্টকারী, দীন থেকে বহিস্কারকারী, যে তাতে পতিত হলো অথচ মৃত্যুর পূর্বে তা থেকে তাওবা করল না, তাকে চিরস্থায়ী ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিল। দলীল, আল্লাহ তা‘আলার বাণী, أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ النمل62 “অথবা কে আছে যিনি নিরুপায়ের আহ্বানে সাড়া দেন এবং বিপদ দূরীভূত করেন?”। [সূরা আন-নামল, আয়াত: ৬২] অর্থাৎ বিপদে পতিত ব্যক্তির ডাকে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ সাড়া দেয় না এবং তিনি ব্যতীত কেউ তার সমস্যা দূরীভূত করে না। যে গায়রুল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করে আল্লাহ তাকে প্রশ্নবোধক শব্দ ব্যবহার করে শাসিয়েছেন। এ ছাড়াও কারণ, আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করা ও সাহায্য চাওয়া ইবাদত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,﴿إِذۡ تَسۡتَغِيثُونَ رَبَّكُمۡ ٩﴾ [الانفال: ٩]   “তোমরা যখন তোমাদের রবের নিকট সাহায্য চাচ্ছিলে”। [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৯] সহীহ বুখারীতে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন আমি যেন তোমাদের কাউকে এ অবস্থায় আসতে না দেখি, সে স্বীয় কাঁধের ওপর একটি চিৎকার রত উট বহন করছে, আর সে আমাকে চিৎকার দিয়ে বলবে, হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে বাঁচান! আর আমি বলব, আজ তোমার জন্যে আমার করার কিছুই নেই। আমি তো তোমাকে পৌঁছে দিয়েছি। তিনি আরো বলেন, আমি তোমাদের কাউকে যেন কিয়ামতের দিন এ অবস্থায় দেখতে না পাই, সে নিজের কাঁধের ওপর হ্রেষা রত ঘোড়া বহন করছে, আর আমাকে চিৎকার দিয়ে বলছে, হে আল্লাহর রাসূল আমাকে বাঁচান! আর আমি বলব, আজ আমি তোমার জন্যে কিছুই করতে পারব না। আমি তো তোমাকে পৌঁছে দিয়েছি”। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম) আমরা জানি, জীবিত উপস্থিত দৃশ্যমান কোনো লোকের ক্ষমতাধীন বিষয়ে তার নিকট ফরিয়াদ করা আমাদের জন্য বৈধ। জীবিত মাখলুকের নিকট ফরিয়াদ করার অর্থ হলো, মানুষ যে বিষয়ে সক্ষম সে ক্ষেত্রে তার কাছে সাহায্য চাওয়া মাত্র। যেমন মুসার সাথী মুসা আলাইহিস সালামের নিকট তাদের উভয়ের শত্রুর বিপক্ষে সাহায্য চেয়েছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿فَٱسۡتَغَٰثَهُ ٱلَّذِي مِن شِيعَتِهِۦ عَلَى ٱلَّذِي مِنۡ عَدُوِّهِۦ ١٥﴾ [القصص: ١٥]    “তার নিজের দলের লোকটি তার শত্রুদলের লোকটির বিরুদ্ধে তার কাছে সাহায্য চাইল”। [সূরা আল-কাসাস, আয়াত: ১৫] কিন্তু অনুপস্থিত জিন, মানুষ ও কবরবাসীদের নিকট ফরিয়াদ করা বাতিল, হারাম ও শির্ক হওয়ার ব্যাপারে সব ইমাম একমত হয়েছেন।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয় যে, আল্লাহ ছাড়া অন্যের প্রতি عبد শব্দটির সম্বন্ধ করে কারো নামকরণ করা কি বৈধ, যেমন আব্দুন নবী (নবীর বান্দা) অথবা আব্দুল হুসাইন (হুসাইনের বান্দা) প্রভৃতি নাম রাখা কি বৈধ?
উত্তর: বল, বৈধ নয়। ইমামগণ গায়রুল্লাহর বান্দা স্থির করে নাম রাখা হারাম হওয়ার ওপর একমত পোষণ করেছেন। তাই গায়রুল্লাহর বান্দা স্থিরীকৃত প্রত্যেক নাম পরিবর্তন করা ওয়াজিব। যেমন আব্দুন নবী অথবা আব্দুর রাসূল অথবা আব্দুল হুসাইন অথবা আব্দুল কাবা প্রভৃতি গায়রুল্লাহর বান্দা স্থিরীকৃত নাম। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় নাম আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রাহমান। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীসে এসেছে, “নিশ্চয় আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় নাম আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রাহমান”। (সহীহ মুসলিম) অতএব যেসব নাম দ্বারা গায়রুল্লাহর বান্দা বুঝানো হয় সেগুলো পরিবর্তন করা ওয়াজিব। আর জীবিত যেসব লোকের নাম দ্বারা গায়রুল্লাহর ইবাদত স্পষ্ট হয়, এ বিধানটি সেসব লোকের নামের ক্ষেত্রে এই হুকুম।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, বদ নযর অথবা হিংসা অথবা বিপদাপদ ও অনিষ্টতা প্রতিরোধ বা দূর করার জন্য গলায় মালা লাগানো বা হাতে অথবা গলায় অথবা গাড়ি ইত্যাদিতে তাগা লটকানোর হুকুম কী?

উত্তর: বল, এটা শির্কের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে তাবিজ লটকালো সে শির্ক করলো”। হাদীসটি ইমাম আহমদ তার মুসনাদে বর্ণনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন: “উটের গলায় ধনুকের রশি (মালা) অথবা কোনো মালাই যেন থাকে। থাকলে যেনে কেটে ফেলা হয়”। হাদীসটি সহীহ বুখারী বর্ণনা করেছেন। তিনি আরো বলেন, “যে তার দাড়ি বাঁধলো অথবা ধনুকের রশি লটকালো অথবা পশুর মল অথবা হাড্ডি দ্বারা ইস্তেঞ্জা করল তার থেকে মুহাম্মাদ সম্পর্কহীন”। হাদীসটি আহমদ বর্ণনা করেছেন। তিনি আরো বলেন, “নিশ্চয় ঝাঁড়-ফুক, তাবিজ ও ভালোবাসার মন্ত্র শির্ক”। হাদীসটি আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন। তিনি আরো বলেন, “যে তাবিজ লটকালো আল্লাহ তার আশা পূর্ণ না করুন”। হাদীসটি ইবনু হিব্বান বর্ণনা করেছেন। অতএব যে ধারণা ও কুসংস্কারের সাথে সম্পৃক্ত হল সে ক্ষতিগ্রস্ত হল। হাদীসে এসেছে: “যে ব্যক্তি কিছু লটকায় তাকে তারই প্রতিই সোপর্দ করা হয়”।

তিওয়ালা: এক প্রকার যাদু, যা সেসময় তারা করতো এবং বিশ্বাস করত, এটি স্বামীকে স্ত্রীর প্রতি প্রিয় করে অথবা উভয়ের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটায়। অনুরূপভাবে তারা এটি দু’জন আত্মীয় অথবা প্রিয় মানুষের মাঝে শত্রুতা সৃষ্টির জন্যও করত।

তামায়েম এমন জিনিস, যা বদ নযর ও হিংসা প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে বাচ্চাদের শরীরে লটকানো হয়।

ইমাম মুনজিরি ‘তামিমা’র অর্থ প্রসঙ্গে বলেন, “এটি হলো পুঁতি বা দানা জাতিয় জিনিষ, যা তারা লটকাত। তারা বিশ্বাস করত যে, এটি তাদের থেকে আপদ দূর করে। এটি হচ্ছে মূর্খতা ও গোমরাহী। কারণ এটি শরীয়ত কিংবা প্রাকৃতিক দিক থেকে আরোগ্য হাসিলের কোনো উপকরণ নয়। উপরোক্ত উদ্দেশ্যে মানুষের হাতে চুরি বা চেইন পরিধান করা, গাড়িতে বা পশুর গলায় কিংবা ঘর-বাড়িতে কাপড়ের টুকরা ঝুলানো ও তাবিজ লটকানোর অন্তর্ভুক্ত।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তাবাররুক অর্থ কি?
উত্তর: বল, বেশ কিছু উপায়-উপকরণ ব্যবহার করে কল্যাণ অন্বেষণ করাকে التبرك (তাবাররুক) বলা হয়। নিজের জন্য কল্যাণ অর্জন, উদ্দেশ্য হাসিল ও পছন্দনীয় বস্তু হাসিল করার জন্য মানুষ এসব উপায়-উপকরণ অবলম্বন করে থাকে।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তাবাররুকের শ্রেণী কি মাত্র একটি? না এর একাধিক প্রকার রয়েছে?
উত্তর: বল, তাবাররুক দুই প্রকার:

১) শরী‘আত সম্মত তাবাররুক: আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাত দ্বারা এ জাতীয় তাবাররুকের বৈধতা প্রমাণিত ও তা দ্বারা মানুষ উপকৃত হওয়ার কথাও সু-সাব্যস্ত। কিতাব ও সুন্নাহের দলীল ব্যতীত কোনো বস্তুতে বরকত আছে বলে বিশ্বাস করা বৈধ নয়। এতে বিবেক ও পছন্দের কোনো দখল নেই। কোনো জিনিস বরকতপূর্ণ বা তাতে বরকত রয়েছে কি না, -প্রজ্ঞাময় সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সংবাদ অথবা তার রাসূলের সংবাদ ব্যতীত আমরা জানি না। আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের অনুসরণ করার মধ্যেই সব রবকত ও কল্যাণ রয়েছে। আমরা তার থেকেই জানতে পারি কোন জিনিসটি বরকতময় ও তার থেকে কিভাবে বরকত হাসিল করব। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সত্তা এবং তার নিঃসৃত জিনিস, যেমন, থুথু, চুল এবং তার শরীরের সাথে যুক্ত পোশাক। এটি শুধু তাঁর সাথে এবং তাঁর থেকে নিঃসৃতই বা তাঁর সাথে সংশ্লিষ্ট জিনিষের খাস। যেমন চুল ও পোশাক। কু-সংস্কারপন্থীরা মিথ্যা রচনা করে যে, তাদের নিকট তাঁর চুল ও কাপড় রয়েছে। এর উদ্দেশ্যে হচ্ছে কতক মুসলিমের বিবেক নিয়ে খেল-তামাশা করা এবং তাদের দীনকে ধ্বংস করা ও তাদের দুনিয়া ছিনিয়ে নেওয়া।

দ্বিতীয় প্রকার: নিষিদ্ধ তাবাররুক: এটি আল্লাহর সাথে শির্ক পর্যন্ত নিয়ে যায়। যেমন নেককার লোক ও তাদের উচ্ছিষ্টাংশ দ্বারা বরকতক হাসিল করা এবং তাদের কবরের নিকট সালাত ও দু‘আ করে বরকত হাসিল করা। তাদের কবরের মাটিকে ঔষধ হিসাবে বিশ্বাস করে তা দ্বারা বরকত হাসিল করা। অনুরূপ কোনো পাথর, গাছ, স্থান ও ভূ-খণ্ডের বিশেষ ফযীলতে বিশ্বাস করে তাতে কাপড় লটকানো অথবা তাওয়াফ করা ও তা দ্বারা বরকত হাসিল করা। এ কথা স্বীকৃত যে, কা‘বার হাজারে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানী ব্যতীত এমন কিছু নেই, যা স্পর্শ ও চুমু খাওয়া বৈধ। হাজারে আসওয়াদ ব্যতীত অন্য কিছুতে স্পর্শ, চুমু খাওয়া ও তাওয়াফ করা নিষিদ্ধ। যে বিশ্বাস করবে এগুলো স্বয়ং বরকত দিতে পারে তার ক্ষেত্রে এটি বড় শির্ক আর যে এগুলোকে বরকতের কারণ মনে করবে তার ক্ষেত্রে এটি ছোট শির্ক হবে।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, সৎ লোকদের উচ্ছিষ্ট ও ব্যবহৃত জিনিষ, পরিত্যক্ত বস্তু, নিদর্শন ইত্যাদি অন্বেষণ করা এবং তাদের ব্যক্তিসত্তা ও নিদর্শন দ্বারা বরকত হাসিল করা কি শরী‘য়ত সম্মত? নাকি বিদ‘আত ও গোমরাহী?

উত্তর: বল, এ বিশ্বাস ও কাজ মানুষের তৈরি, বিদ‘আত। কেননা আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথীগণ উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী, উত্তম বুঝবান, কল্যাণের প্রতি সবচেয়ে বেশি আগ্রহী এবং মর্যাদাবানদের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী জ্ঞানী ছিলেন। কিন্তু তারা আবু বকর, ওমর, উসমান ও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুমের ব্যবহৃত জিনিস, উচ্ছিষ্ট বস্তু ও নিদর্শন দ্বারা বরকত হাসিল করেননি। তারা তাদের নিদর্শন অনুসন্ধান করেননি। অথচ তারাই নবীগণের পর সর্বোত্তম মানুষ ছিলেন। তারা জানতেন বরকত হাসিল করা একমাত্র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সত্তার সাথেই খাস ছিল। সীমালঙ্ঘন হওয়ার আশঙ্কায়ে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বায়‘আতে রিদওয়ানের গাছটি কেটে ফেলেছেন। নেককারগণ কল্যাণ অর্জনের প্রতি সবচেয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন। তাদের ব্যবহৃত, পরিত্যক্ত নিদর্শন অন্বেষণ করার মধ্যে যদি ফযীলত থাকত, তাহলে আমাদের আগে তারাই তা অর্জনে অগ্রগামী হতেন।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, গাছ-গাছপালা অথবা পাথরসমূহ কিংবা মাটি দ্বারা কি বরকত হাসিল করা যায়?
উত্তর: বল, এটি শির্কের অন্তর্ভুক্ত। ইমাম আহমদ ও তিরমিযী আবূ ওয়াকেদ আল লাইসী থেকে বর্ণনা করেন যে, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হুনাইনে বের হলাম। তখন আমরা ছিলাম নতুন মুসলিম। সেখানে মুশরিকদের একটি বড়ই গাছ ছিল। তারা তার পাশে অবস্থান করত এবং তাতে নিজেদের অস্ত্রগুলো ঝুলিয়ে রাখত। তাকে ‘যাতু আনওয়াত’ বলা হতো। তিনি বলেন, আমরা সেই বড়ই গাছের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম এবং বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের জন্য একটি যাতু আনওয়াত নির্ধারণ করুন। তখন আল্লাহর রাসূল বললেন, আল্লাহু আকবর। এ হলো তরীকা। যার হাতে আমার জীবন তার শপথ! তোমরা এমন একটি কথা বলছ যেমন বলেছিল বনী ইসরাঈল মূসা আলাইহিস সালামকে।﴿ٱجۡعَل لَّنَآ إِلَٰهٗا كَمَا لَهُمۡ ءَالِهَةٞۚ قَالَ إِنَّكُمۡ قَوۡمٞ تَجۡهَلُونَ ١٣٨﴾ [الاعراف: ١٣٧]   “আপনি আমাদের জন্য একটি ইলাহ নির্ধারণ করুন যেমন তাদের রয়েছে ইলাহ। তিনি বললেন, নিশ্চয় তোমরা মূর্খজাতী”। [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৩৮] তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতিনীতির অনুসরণ করবে।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, গাইরুল্লাহ এর নামে কসম করার হুকুম কী?
উত্তর: বল, গাইরুল্লাহ এর নামে কসম করা বৈধ নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে কসম করতে চায় সে যেন আল্লাহর কসম করে অথবা চুপ থাকে”। (সহীহ বুখারী) তিনি গায়রুল্লাহ এর নামে কসম করতে নিষেধ করেছেন। যেমন তার বাণীতে এসেছে, “তোমরা তোমাদের পূর্ব-পুরুষ ও তাগুতদের কসম করো না”। (সহীহ মুসলিম) الطواغي শব্দটি طاغوت এর বহুবচন। নবী সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম এটাকে শির্কের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন, “যে গায়রুল্লাহের নামে কসম করল সে কুফরি করল অথবা শির্ক করল”। তিনি আরো বলেছেন, “যে আমানতের কসম করল সে আমাদের দল ভুক্ত নয়”। হাদীসটি ইমাম আহমদ, ইবনে হিব্বান ও হাকিম সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন।

অতএব মুসলিমগণের উচিত নবী অথবা অলী অথবা সম্মান অথবা আমানত অথবা কা‘বা এবং অন্যান্য মাখলুকের কসম করা থেকে বিরত থাকা।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আমাদের কি এ বিশ্বাস করা বৈধ যে, তারকাসমূহ বা নক্ষত্ররাজি কল্যাণ, তাওফীক ও সৌভাগ্য লাভে কিংবা অকল্যাণ, অপছন্দনীয় বস্তু ও মুসিবত দূর করার ক্ষেত্রে সৃষ্টিজগৎ ও মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম?
উত্তর: বল, এরূপ বিশ্বাস করা জায়েয নয়। কারণ, এ বিষয়ে তার কোনো প্রভাব নেই। আর দুর্বল বিবেক ও ধারণার অনুসারী ব্যতীত কেউ এসব মিথ্যুকদের কল্পকাহিনীতে বিশ্বাস করে না। এরূপ বিশ্বাস করা শির্ক। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীসে কুদসিতে বলেছেন, “আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যে বলল আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতে আমরা বৃষ্টি লাভ করেছি, সে আমার প্রতি বিশ্বাসী ও নক্ষত্রকে অস্বীকারকারী। আর যে বলল, আমরা অমুক অমুক তারকার কারণে বৃষ্টি লভ করেছি, সে আমার প্রতি অবিশ্বাসী ও তারকার প্রতি বিশ্বাসী”। হাদীসটি সহীহ বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন। অতএব জাহেলী সমাজ বিশ্বাস করত যে, বৃষ্টির আগমনে তারকারাজির প্রভাব রয়েছে।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, এ বিশ্বাস করা কি বৈধ যে, মানুষ জীবনে যে সৌভাগ্য লাভ এবং দুর্ভাগ্যের শিকার হয়, তাতে রাশিফল যেমন কুম্ভ-রাশি অথবা অন্যান্য রাশির অথবা তারকা ও নক্ষত্ররাজির প্রভাব রয়েছে? এগুলোর মাধ্যমে কি ভবিষ্যতের অদৃশ্য বিষয়সমূহ জানা সম্ভব?
উত্তর: বল, মানুষের জীবনে ভালো-মন্দ যা কিছু হয় তাতে রাশিফল, তারকা ও নক্ষত্রসমূহের প্রভাব আছে বলে বিশ্বাস করা বৈধ নয়। আর এগুলো দ্বারা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানা যায় না। কেননা, গায়েবের ইলম আল্লাহর কাছেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “বল, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ আসমানসমূহে ও যমীনের গায়েব জানে না”। [সূরা আন-নামাল: ৬৫] এ ছাড়াও কারণ, আল্লাহ একাই কল্যাণ আনয়নকারী ও অকল্যাণ দূরকারী। যে বিশ্বাস করল, অমুক রাশি অথবা অমুক অমুক তারকার মাধ্যমে গায়েব জানা যায় অথবা অমুক রাশি কিংবা অমুক অমুক তারকা উদয়ের সময় যে সন্তান জন্মলাভ করে, তার মঙ্গল বা অমঙ্গলের ক্ষেত্রে তারকা ও রাশিসমূহের প্রভাব রয়েছে এবং সন্তানকে ভাগ্যবান অথবা হতভাগা করার ক্ষেত্রে তারকার প্রভাব রয়েছে, সে আল্লাহর হক ও তাঁর রুবুবিয়্যার বৈশিষ্টগুলোতে তারকাকে শরীক করলো। যে এরূপ করল সে কুফরি করল। আমরা আল্লাহর নিকট এ থেকে আশ্রয় চাই।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা দ্বারা ফয়সালা করা কি আমাদের ওপর ওয়াজিব?
উত্তর: বল, সকল মুসলিমের ওপর ওয়াজিব আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা দ্বারা ফয়সালা করা। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَأَنِ ٱحۡكُم بَيۡنَهُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ وَلَا تَتَّبِعۡ أَهۡوَآءَهُمۡ وَٱحۡذَرۡهُمۡ أَن يَفۡتِنُوكَ عَنۢ بَعۡضِ مَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ إِلَيۡكَۖ فَإِن تَوَلَّوۡاْ فَٱعۡلَمۡ أَنَّمَا يُرِيدُ ٱللَّهُ أَن يُصِيبَهُم بِبَعۡضِ ذُنُوبِهِمۡۗ وَإِنَّ كَثِيرٗا مِّنَ ٱلنَّاسِ لَفَٰسِقُونَ ٤٩﴾ [المائ‍دة: ٤٩]   “আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা দ্বারা তাদের মধ্যে ফয়সালা করো এবং তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। আর তাদের থেকে সতর্ক থাক যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তার কিছু থেকে তারা তোমাকে বিচ্যুত করবে। অতঃপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে জেনে রাখ যে, আল্লাহ তো কেবল তাদেরকে তাদের কিছু পাপের কারণেই আযাব দিতে চান। আর অনেক মানুষই ফাসিক”। [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৪৯] আর যে মানুষের তৈরি আইন-কানুন ও বিধান অনুসন্ধান করে আল্লাহ তার দোষারোপ করেছেন এভাবে, ﴿أَفَحُكۡمَ ٱلۡجَٰهِلِيَّةِ يَبۡغُونَۚ وَمَنۡ أَحۡسَنُ مِنَ ٱللَّهِ حُكۡمٗا لِّقَوۡمٖ يُوقِنُونَ ٥٠﴾ [المائ‍دة: ٥٠]   “তারা কি জাহিলিয়্যাতের ফয়সালা চায়? আর বিশ্বাসী কওমের জন্য বিধান প্রদানে আল্লাহর চেয়ে কে উত্তম?” [সূরা আল-মায়েদাহ আয়াত: ৫০]
প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, শাফা‘আত কি?
উত্তর: বল, শাফাআত বা সুপারিশ হচ্ছে কল্যাণ ও উপকার হাসিল বা অনিষ্ট ও ক্ষতি দূর করার জন্যে মধ্যস্থতা করা অথবা অপরকে মধ্যস্থতাকারী বানানো।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, সুপারিশের প্রকারগুলো কী কী?

উত্তর: বল, শাফা‘আত তিন প্রকার:

১) সু-সাব্যস্ত ও গ্রহণযোগ্য শাফা‘আত যা কেবল আল্লাহর কাছেই চাওয়া হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿قُل لِّلَّهِ ٱلشَّفَٰعَةُ جَمِيعٗاۖ ٤٤ ﴾ [الزمر: ٤٣]  “বল, সকল সুপারিশ আল্লাহর জন্যই”। [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৪৪] এ সুপারিশ হচ্ছে জাহান্নামের আগুন থেকে নিরাপত্তা ও জান্নাতের নি‘আমত লাভ করে সফল হওয়ার প্রার্থনা। এর জন্য রয়েছে দু’টি শর্ত:

ক) সুপারিশ-কারীর জন্যে সুপারিশ করার অনুমতি থাকা। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿مَن ذَا ٱلَّذِي يَشۡفَعُ عِندَهُۥٓ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦۚ ٢٥٥﴾ [البقرة: ٢٥٥]   “কে আছে যে তার নিকট তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করবে?” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৫]
খ) সুপারিশকৃত (যার জন্য সুপারিশ করা হবে) ব্যক্তির প্রতি সন্তুষ্টি থাকা। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَلَا يَشۡفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ٱرۡتَضَىٰ ٢٨﴾ [الانبياء: ٢٨]   “আর তারা সুপারিশ করবে না, তবে যার জন্যে তিনি সন্তুষ্ট হবেন”। [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৮] আল্লাহ তা‘আলা এ দু’টি শর্তকে তার বাণীতে একত্র করে বলেন,﴿وَكَم مِّن مَّلَكٖ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ لَا تُغۡنِي شَفَٰعَتُهُمۡ شَيۡ‍ًٔا إِلَّا مِنۢ بَعۡدِ أَن يَأۡذَنَ ٱللَّهُ لِمَن يَشَآءُ وَيَرۡضَىٰٓ ٢٦ ﴾ [النجم : ٢٦]  “আর আসমানসমূহে অনেক ফিরিশতা আছে, যাদের সুপারিশ কোন উপকারে আসবে না, তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন এবং যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট, তার ব্যাপারে অনুমতি দেওয়ার পর”। [সূরা আন-নাজম, আয়াত: ২৬] অতএব যে শাফা‘আত দ্বারা উপকৃত হতে চায় সে যেন আল্লাহর নিকট তা প্রার্থনা করে। তিনিই তার মালিক এবং তার অনুমতি প্রদানকারী। তিনি ব্যতীত কারো নিকট এটি প্রার্থনা করা যায় না। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যখন তুমি প্রার্থনা করবে আল্লাহর কাছেই করবে”। (তিরমিযী) অতএব তুমি বল, হে আল্লাহ! আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করো, যাদের জন্য কিয়ামতের দিন তোমার নবী সুপারিশ করবেন।

২) অগ্রহণযোগ্য সুপারিশ; যে বিষয়ে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ ক্ষমতা রাখে না তা গাইরুল্লাহ এর কাছে চাওয়া হয়। এটি শির্কী সুপারিশ।

৩) মাখলুকের পারস্পরিক দুনিয়াবী সুপারিশ: এটি হচ্ছে দুনিয়াতে জীবিত মাখলুকের একে অপরের জন্যে ঐসব বিষয়ে সুপারিশ করা, যে ব্যাপারে তারা সক্ষম। দুনিয়াবী প্রয়োজনে এটির জন্য একে অপরের মুখাপেক্ষী হয়। এটি যদি কল্যাণের ক্ষেত্রে হয় তাহলে মুস্তাহাব। আর যদি মন্দের ক্ষেত্রে হয় তাহলে হারাম। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,  ﴿مَّن يَشۡفَعۡ شَفَٰعَةً حَسَنَةٗ يَكُن لَّهُۥ نَصِيبٞ مِّنۡهَاۖ وَمَن يَشۡفَعۡ شَفَٰعَةٗ سَيِّئَةٗ يَكُن لَّهُۥ كِفۡلٞ مِّنۡهَاۗ ٨٥﴾ [النساء : ٨٥]   “যে ভাল সুপারিশ করবে, তার জন্য এ থেকে একটি অংশ থাকবে এবং যে মন্দ সুপারিশ করবে তার জন্যেও তা থেকে একটি অংশ”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৮৫]
প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, নবীগণ, নেককার লোক ও শহীদদের নিকট কি সুপারিশ চাওয়া যাবে, কারণ, কিয়ামতের দিন তারা সুপারিশ করবেন?
উত্তর: বল, সুপারিশ আল্লাহর মালিকানাধীন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿قُل لِّلَّهِ ٱلشَّفَٰعَةُ جَمِيعٗاۖ ٤٤﴾ [الزمر: ٤٣] “বল, সকল সুপারিশ আল্লাহর জন্যে”। [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৪৪] অতএব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুকরণে আমরা সুপারিশের মালিক ও অনুমতি দাতা আল্লাহর নিকট সুপারিশ প্রার্থনা করব, যিনি বলেছেন, “যখন তুমি চাইবে আল্লাহর নিকট চাইবে”। হাদীসটি তিরমিযী বর্ণনা করেছেন। অতএব আমরা বলব, হে আল্লাহ! আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করো, যাদের জন্য তোমার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিয়ামতের সুপারিশ করবেন।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, যে তার উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য নিজের ও আল্লাহর মাঝে মৃতদেরকে সুপারিশকারী স্থির করে তার হুকুম কি?
উত্তর: বল, এটি বড় শির্ক। কারণ যারা তাদের ও আল্লাহর মাঝে সুপারিশকারী স্থির করেছে আল্লাহ তা‘আলা তাদের নিন্দা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাদের সম্পর্কে বলেন, ﴿وَيَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمۡ وَلَا يَنفَعُهُمۡ وَيَقُولُونَ هَٰٓؤُلَآءِ شُفَعَٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِۚ قُلۡ أَتُنَبِّ‍ُٔونَ ٱللَّهَ بِمَا لَا يَعۡلَمُ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَلَا فِي ٱلۡأَرۡضِۚ سُبۡحَٰنَهُۥ وَتَعَٰلَىٰ عَمَّا يُشۡرِكُونَ ١٨﴾ [يونس : ١٨]    “আর তারা আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর ইবাদত করছে, যা তাদের ক্ষতি করতে পারে না এবং উপকারও করতে পারে না। তারা বলে, ‘এরা আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী। বল, তোমরা কি আল্লাহকে এমন বিষয়ে সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি অবগত নন, না আসমানসমূহে আর না পৃথিবীতে? তিনি পবিত্র-মহান এবং তারা যা শরীক করে, তিনি তার অনেক ঊর্ধ্বে”। [সূরা ইউনুস, আয়াত: ১৮] আল্লাহ তাদেরকে শির্কের দোষে দূষিত করে বলেছেন, “তারা যে শির্ক করে তা থেকে তিনি পুত-পবিত্র”। অতঃপর তিনি তাদেরকে কাফের বলেছেন। তিন বলেন,﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ كَٰذِبٞ كَفَّارٞ ٣﴾ [الزمر: ٣]  “নিশ্চয় মিথ্যাবাদী কাফিরকে আল্লাহ হিদায়াত দেন না”। [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৩] আর আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেন যে, তারা তাদের সুপারিশাকারীদের সম্পর্কে বলে,

﴿أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُۚ وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ ٣﴾ [الزمر: ٣] 

“যারা আল্লাহকে ছাড়া অন্যদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, ‘আমরা কেবল এ জন্যই তাদের ইবাদত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে”। [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৩]
প্রশ্ন: যখন তোমাকে বলা হয়, আল্লাহর বাণী: ﴿وَلَوۡ أَنَّهُمۡ إِذ ظَّلَمُوٓاْ أَنفُسَهُمۡ جَآءُوكَ فَٱسۡتَغۡفَرُواْ ٱللَّهَ وَٱسۡتَغۡفَرَ لَهُمُ ٱلرَّسُولُ لَوَجَدُواْ ٱللَّهَ تَوَّابٗا رَّحِيمٗا ٦٤ ﴾ [النساء : ٦٤]   “আর তারা যখন নিজেদের প্রতি যুলম করেছিল তখন তোমার কাছে আসত ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইত এবং রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা চাইতেন, তাহলে অবশ্যই তারা আল্লাহকে তাওবা কবুলকারী, দয়ালু পেত”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬৪] এ থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর পরও কি তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন করা বৈধ প্রমাণিত হয়?
উত্তর: বল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন করা তার জীবিত থাকার সাথেই খাস; তাঁর মৃত্যুর পর নয়। সাহাবীগণ ও উত্তম যুগের লোকদের থেকে সহীহ সনদে প্রমাণিত হয়নি যে, তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর পর তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা আবেদন করত। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা যখন নিজের জন্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দু‘আ ও তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন করলে, তখন তিনি বলেছেন, “আমি জীবিত থাকলে তোমার জন্যে ইস্তেগফার ও দু‘আ করব”। (সহীহ বুখারী) হাদীসটি আয়াতের ব্যাখ্যা করছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন করা তাঁর জীবনের সাথে খাস; তার মৃত্যুর পর নয়। তার মৃত্যুর পর তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন করা হয়নি। উত্তম যুগ শেষ হওয়ার পর এবং বিদ‘আত সয়লাব ও মূর্খতা ছড়িয়ে পড়ার পর পরবর্তী যুগে কতক লোক এরূপ কাজ করে যাচ্ছে। অতএব তাদের কতকের এরূপ কাজ সাহাবী ও উত্তম-ভাবে তাদের অনুসারী গভীর জ্ঞান সম্পন্ন সালাফে সালেহীন ও সঠিক পথপ্রাপ্ত ইমামদের নীতির পরিপন্থী।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আল্লাহর বাণী: ﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَٱبۡتَغُوٓاْ إِلَيۡهِ ٱلۡوَسِيلَةَ٣٥﴾ [المائ‍دة: ٣٥]   “হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং তার উসীলা তালাশ করো”। [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৩৫]-এর অর্থ কি?
উত্তর: বল, এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা। এটি সেই উসিলা, আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করার জন্যে যার নির্দেশ তিনি প্রদান করেছেন। যে জিনিস কাউকে লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে পৌঁছিয়ে দেয়, তাই উসীলা । আল্লাহ ও তার রাসূল যে তাওহীদ ও আনুগত্যের অনুমোদন দিয়েছেন তা ব্যতীত অন্য কিছু অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছায় না। অলী ও কবরবাসীদের প্রতি মনোনিবেশ করা নাজাতের উসিলা নয়। এটা নাম পরিবর্তনের অধ্যায় থেকে এবং জিনিষের আসল নাম বদল করে অন্য নামে নামকরণ করা মাত্র। জান্নাতে যাওয়ার পথ ও হিদায়াতের রাস্তা ভুলিয়ে মানুষকে বিচ্যুত করার জন্য মানুষ শয়তান ও জিন শয়তানের ধোঁকা মাত্র।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তাওয়াসসুল কি?
উত্তর: বল, তাওয়াসসুলের মূল অর্থ হচ্ছে নৈকট্য অর্জন করা। আর শরী`য়তের পরিভাষায় আল্লাহর আনুগত্য, তাঁর ইবাদত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ এবং আল্লাহর প্রিয় ও পছন্দনীয় প্রত্যেক আমল দ্বারা তাঁর নৈকট্য অর্জন করা।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তাওয়াসসুল কত প্রকার?
উত্তর: বল, উসীলা দুই প্রকার। শরীয়ত সম্মত উসীলা ও অবৈধ উসীলা।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, শরীয়ত সম্মত উসীলাগুলো কী কী?
উত্তর: বল, (ক) আল্লাহর নামসমূহের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য হাসিল করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আল্লাহর জন্যে রয়েছে অতি সুন্দর নামসমূহ। অতএব তোমরা তাঁকে তাঁর নাম দ্বারাই আহ্বান কর”। আর তাঁর সিফাতসমূহের মাধ্যমে। যেমন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীতে এসেছে, يا حي يا قيوم برحمتك استغيث “হে চিরঞ্জীব ও চির প্রতিষ্ঠিত-সবকিছুর ধারক! তোমার রহমতের উসিলায় তোমার কাছে ফরিয়াদ করছি। এখানে রহমত সিফাত দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করা হয়েছে।

(খ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত মোতাবেক আল্লাহর জন্য সম্পাদিত খালেস সৎ আমল দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করা। যেমন কেউ বলে, হে আল্লাহ! তোমার জন্যে আমার ইখলাস ও তোমার নবীর সুন্নাতের অনুসরণ করার উসিলায় আমাকে আরোগ্য ও রিজিক দান করো। অনুরূপ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়নের উসীলায় তাঁর নৈকট্য হাসিল করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,  ﴿رَّبَّنَآ إِنَّنَا سَمِعۡنَا مُنَادِيٗا يُنَادِي لِلۡإِيمَٰنِ أَنۡ ءَامِنُواْ بِرَبِّكُمۡ فَ‍َٔامَنَّاۚ رَبَّنَا فَٱغۡفِرۡ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرۡ عَنَّا سَيِّ‍َٔاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ ٱلۡأَبۡرَارِ ١٩٣﴾ [ال عمران: ١٩٣]   “হে আমাদের রব! নিশ্চয় আমরা এক আহ্বায়ককে ঈমানের দিকে আহবান করতে শুনেছি যে, তোমরা তোমাদের রবের প্রতি ঈমান আনো। তাই আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের রব! আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করো এবং মোচন করো আমাদের গুনাহসমূহ আর নেককারদের সাথে আমাদের মৃত্যু দাও”। [সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৯৩] এভাবে উসীলা পেশ করার পর তারা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেছে যে, ﴿رَبَّنَا وَءَاتِنَا مَا وَعَدتَّنَا عَلَىٰ رُسُلِكَ وَلَا تُخۡزِنَا يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِۖ إِنَّكَ لَا تُخۡلِفُ ٱلۡمِيعَادَ ١٩٤ ﴾ [ال عمران: ١٩٤]  “হে আমাদের রব! তোমার রাসূলদের জবানে তুমি আমাদেরকে যা দেয়ার ওয়াদা করেছো, তা আমাদেরকে দান করো। আর কিয়ামতের দিন তুমি আমাদেরকে অপমান করো না। নিশ্চয় তুমি ভঙ্গ করো না অঙ্গিকার”। [সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৯৪] পাথরের কারণে গুহায় আটকা পড়া লোকেরা তাদের সৎ আমল দ্বারা আল্লাহর শরণাপন্ন হয়েছিল, আল্লাহ যেন তাদেরকে মুসীবত থেকে উদ্ধার করেন। যেমন সহীহ বুখারী ও মুসলিমে ইবনে উমারের হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন তিন লোকের ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যারা গর্তে থাকাবস্থায় একটি পাথর গুহার মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল। ফলে তারা নিজেদের নেক আমল দ্বারা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেন যাতে বিপদে তিনি তাদের উদ্ধার করেন। ফলে পাথর সরে যায়।

(গ) উপস্থিত সক্ষম নেককার বান্দার দু‘আর উসীলা দেয়া। যেমন, কোনো নেককার লোকের নিকট আবদার করল, তিনি যেন তার জন্যে আল্লাহর নিকট দু‘আ করেন। যেমন সাহাবীগণ আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে আবেদন করেছিলেন তিনি যেন বৃষ্টির জন্যে আল্লাহর নিকট দু‘আ করেন। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু ওয়াইস কারনীকে বলেছিলেন, তিনি যেন তার জন্যে দু‘আ করেন। ইয়াকুব আলাইহিস সালামের সন্তানেরা তাঁর নিকট আবেদন করেছিল, তিনি যেন আল্লাহর নিকট তাদের জন্য ক্ষমা চান। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿قَالُواْ يَٰٓأَبَانَا ٱسۡتَغۡفِرۡ لَنَا ذُنُوبَنَآ إِنَّا كُنَّا خَٰطِ‍ِٔينَ ٩٧﴾ [يوسف: ٩٦]   “তারা বলল, হে আমাদের পিতা! আমাদের পাপ মোচনের জন্যে ক্ষমা চান। নিশ্চয় আমরা ছিলাম অপরাধী”। [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৯৭]
প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, অবৈধ উসীলা কি?
উত্তর: বল, যে উসীলাকে শরী‘আত বাতিল করেছে, তাই নিষিদ্ধ উসীলা। যেমন, কেউ মৃতদের উসীলা পেশ করল এবং তাদের নিকট মদদ ও সুপারিশ প্রার্থনা করল। সকল উম্মতের ঐকমতে এটা শির্কী উসীলা। যদিও তারা নবী অথবা অলী হয়ে থাকেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,﴿وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَى ٞ ٣ ﴾ [الزمر: ٣]  “আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, ‘আমরা কেবল এ জন্যই তাদের ইবাদত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৩] অতঃপর তাদের গুনাগুণ তুলে ধরেন তাদের উপর সিদ্ধান্ত দেওয়ার মাধ্যমে।আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُۚ وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِي مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ كَٰذِبٞ كَفَّارٞ ٣﴾ [الزمر: ٣]    “যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছে আল্লাহ নিশ্চয় সে ব্যাপারে তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী কাফির। নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত করেন না”। [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৩] তাদের ওপর কুফরি ও দীন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। অনুরূপ শরী‘য়ত নিষিদ্ধ উসীলা হলো, যে ব্যাপারে শরী‘য়াত চুপ রয়েছে। কারণ তাওয়াসসুল এক প্রকার ইবাদত। আর ইবাদত অহীর ওপর নির্ভরশীল। অবৈধ উসীলার উদাহরণ হলো, কারো সম্মান অথবা সত্তা অথবা অন্য কিছুর দ্বারা উসীলা দেয়া। যেমন কতক লোকের কথা: হে আল্লাহ! হাবীবের সম্মানে আমাকে ক্ষমা কর। অথবা হে আল্লাহ! আমরা তোমার নবী অথবা নেককার লোকের সম্মান অথবা অমুকের মাটির উসিলায় তোমার কাছে প্রার্থনা করছি। এরূপ উসীলা আল্লাহ ও তাঁর নবী অনুমোদন করেননি। তাই এটি এমন বিদআত, যা থেকে সতর্ক থাকা ওয়াজিব। এরূপ উসীলা ও ইতিপূর্বে যে নিষিদ্ধ উসীলার কথা বর্ণনা হলো, সাহাবী, তাবেঈ ও হেদায়াতপ্রাপ্ত ইমামদের কারো থেকে জানা যায়নি। আল্লাহ তাদের সবার ওপর সন্তুষ্ট হোন।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, পুরুষদের কবর যিয়ারত কত প্রকার?
উত্তর: বল, পুরুষদের কবর যিয়ারত দুই প্রকার: ১) শরী‘আত সম্মত যিয়ারত। দুই কারণে এ যিয়ারতকারী সাওয়াব লাভ করবে। কারণ দু’টি হচ্ছে,

(ক) আখিরাতের স্মরণ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত থেকে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু এখন তোমরা কবর যিয়ারত করতে পারো। কারণ, তা আখিরাত স্মরণ করিয়ে দেয়”। (সহীহ মুসলিম)

(খ) মৃতদের ওপর সালাম ও তাদের জন্যে দু‘আ। যেমন, আমরা বলব, السلام عليكم أهل الديار من المؤمنين “হে মুমিন মুমিন-মুসলিম কবরবাসীগণ! আপনাদের ওপর সালাম .” ফলে যিয়ারতকারী ও যিয়ারতকৃত উভয়ই উপকৃত হয়।

২) শরীয়ত বহির্ভূত যিয়ারত: শরীয়ত বহির্ভূত যিয়ারতের কারণে যিয়ারতকারী গুনাহগার হয়। আর তা হচ্ছে যে যিয়ারত দ্বারা মৃত ব্যক্তিদের কবরের নিকট দু‘আ করা উদ্দেশ্য হয় অথবা তাদের দ্বারা আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করা হয়। এটি এমন বিদ‘আত, যা শির্ক পর্যন্ত নিয়ে যায়। অথবা মৃতদের কাছে ফরিয়াদ করা, তাদের দ্বারা সুপারিশ প্রার্থনা করা ও তাদের থেকে সাহায্য চাওয়ার দিকে নিয়ে যায়। এটি বড় শির্ক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

 ﴿ذَٰلِكُمُ ٱللَّهُ رَبُّكُمۡ لَهُ ٱلۡمُلۡكُۚ وَٱلَّذِينَ تَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ مَا يَمۡلِكُونَ مِن قِطۡمِيرٍ ١٣﴾ [فاطر: ١٣]    

“তিনি আল্লাহ, তোমাদের রব; সমস্ত কর্তৃত্ব তাঁরই। আল্লাহকে ছাড়া যাদেরকে তোমরা ডাকো তারা খেজুরের আঁটির আবরণেরও মালিক নয়। যদি তোমরা তাদেরকে ডাক, তারা তোমাদের ডাক শুনবে না; আর শুনতে পেলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেবে না এবং কিয়ামতের দিন তারা তোমাদের শরীক করাকে অস্বীকার করবে। আর সর্বজ্ঞ আল্লাহর ন্যায় কেউ তোমাকে অবহিত করবে না”। [সূরা ফাতির, আয়াত: ১৩-১৪]
প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, কবর যিয়ারতের সময় কি বলবে?
উত্তর: বল, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথীদের কবর যিয়ারতের সময় যা বলার নির্দেশনা দিয়েছেন তাই বলবো, السلام عليكم دار قوم مؤمنين وأتاكم ما توعدون غداً مؤجلون وإنا إن شاء الله بكم لاحقون “হে মুমিন-মুসলিম কবরবাসীগণ! আপনাদের ওপর সালাম। তোমাদের সাথে যে ওয়াদা করা হয়েছিল তা তোমাদের নিকট এসে গেছে। কিয়ামত পর্যন্ত তোমরা অবকাশে থাক। ইনশাআল্লাহ অবশ্যই আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হবো। হাদীসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন। অতঃপর আল্লাহর নিকট তাদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও মর্যাদা বৃদ্ধির এবং আরো অন্যান্য ভালো দু‘আ করবো।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, নেককার লোকের কবরের নিকট দু‘আ করে কি আমরা আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করব?
উত্তর: বল, নেককার লোকদের কবরের পাশে আল্লাহর নিকট দু‘আ করা একটি নব্য বিদ‘আত। আর এটি শির্কের মাধ্যম। আলী বিন হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি এক ব্যক্তিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবরের নিকট দু‘আ করতে দেখে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তোমরা আমার কবরকে ঈদে পরিণত কর না”। যিয়াউল মাকদিসী (আল-মুখতারা: ৪২৮) গ্রন্থে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। কোনো একজন সাহাবী থেকে সহীহ সনদে কখনোই প্রমাণিত নয় যে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবরে এসে আল্লাহর নিকট দু‘আ করতেন। অনুরূপ ইহসানের সাথে তাদের অনুসারী তাবেঈগণ সাহাবী ও উম্মতের মহান ব্যক্তিদের কবরের নিকট দু‘আ করতে সচেষ্ট হননি। এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা মাত্র। এ দ্বারা সে পরবর্তীকালের কতক লোকের বিবেক শিকার করেছে, ফলে তাদের সালফে সালেহীনগণ যাকে খারাব মনে করত, যা থেকে বিরত থাকতো, তার নিকৃষ্টতা ও ঘৃণ্য পরিণতির সম্পর্কে জানা থাকার কারণে তা থেকে নিষেধ করত এবং পরবর্তীকালের লোকদের ইলম, জ্ঞান, বুঝ ও মর্যাদা কম হওয়াতে তারা তা ভুলে গিয়ে শয়তানের ফাঁদসমূহে জড়িয়ে পড়ে এবং বিদ‘আতকে সুন্দরভাবে পেশ করে তাদেরকে শির্কের গভীর অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে গেছে। আমরা আল্লাহর নিকট এ থেকে শ্রয় চাই।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, বাড়াবাড়ি কি এবং তার প্রকারভেদ আছে কি?
উত্তর: বল, বাড়াবাড়ি হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করা। শরী‘য়াত অনুযায়ী যা কাম্য ও অনুমোদিত তার ওপর অতিরিক্ত করা দ্বারা হয়ে থাকে এবং ইবাদত মনে করে কোনো কিছু ত্যাগ করা দ্বারাও হয়ে থাকে।

বিধ্বংসী বাড়াবাড়ির আরেকটি প্রকার: নবীগণ ও নেককার লোকদের উপযুক্ত মর্যাদা থেকে আরো বেশী ওপরে উঠানো বিষয়ে বাড়াবাড়ি করা এবং তারা যে ভালোবাসা, সম্মান ও মর্যাদার হকদার তাতে বাড়াবাড়ি করা, রুবুবিয়াতের সিফাত তাদের জন্য প্রদান করা বা কতক ইবাদত তাদের জন্য সম্পাদন করা এবং তাদের প্রশংসা ও গুণাগুণ বর্ণনায় এমন বাড়াবাড়ি করা, যা তাদেরকে ইলাহ এর মর্যাদায় উন্নীত করে।

আরেকটি বাড়াবাড়ি: আল্লাহ যেসব বৈধ বস্তু মানুষের উপকারের জন্য সৃষ্টি করেছেন, যেমন খাবার, পানীয় এবং মানুষ যার মুখাপেক্ষী হয় যেমন ঘুম ও বিবাহ সেগুলোকে স্থায়ীভাবে ত্যাগ করার মাধ্যমে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ইবাদত করা।

আরেকটি ঘৃণ্য বাড়াবাড়ি হচ্ছে, তাওহীদপন্থী মুসলিমদের ওপর কুফরের ফায়সালা দেওয়া এবং তার ভিত্তিতে সম্পর্কচ্ছেদ, পরিত্যাগ, যুদ্ধ ও সীমালঙ্ঘন করা এবং সম্মান, সম্পদ ও রক্ত হালাল জানা।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে বলা হয়, বাড়াবাড়ি থেকে সতর্ককারী কয়েকটি শর‘য়ী দলীল উল্লেখ কর।
উত্তর: বল, বাড়াবাড়ি থেকে নিষেধকারী দলীলসমূহ কুরআন ও সুন্নাহে অঢের। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “আর না আমি ভানকারীদের অন্তর্ভুক্ত”। [সূরা সোয়াদ, আয়াত: ৮৬] আল্লাহ তা‘আলা বনী ইসরাইলকে দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ﴿يَٰٓأَهۡلَ ٱلۡكِتَٰبِ لَا تَغۡلُواْ فِي دِينِكُمۡ ١٧١﴾ [النساء : ١٧١]   “ হে আহলে কিতাব তোমরা তোমাদের দীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করো না”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৭১] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা বাড়াবাড়ি থেকে সাবধান থেকো। কারণ, তোমাদের পূর্ববর্তীরা বাড়াবাড়ির কারণেই ধ্বংস হয়েছে”। হাদীসটি আহমদ বর্ণনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন, “বাড়াবাড়ি-কারীরা ধ্বংস হয়েছে; বাড়াবাড়ি-কারীরা ধ্বংস হয়েছে; বাড়াবাড়ি-কারীরা ধ্বংস হয়েছে”। হাদীসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

প্রশ্ন: যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, কা‘বা ঘর ছাড়া অন্যত্র তাওয়াফ করা কি বৈধ?
উত্তর: বল, কা‘বা ঘর ছাড়া অন্যত্র তাওয়াফ করা বৈধ নয়। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা তাওয়াফের সাথে তার ঘরকেই খাস করেছেন। তিনি বলেন, ﴿ وَلۡيَطَّوَّفُواْ بِٱلۡبَيۡتِ ٱلۡعَتِيقِ ٢٩ ﴾ [الحج : ٢٩]   “এবং প্রাচীন ঘরের তাওয়াফ কর”। [সূরা সূরা হাজ্জ, আয়াত: ২৯] সুতরাং কা‘বাঘর অন্য ঘরের তাওয়াফ করার অনুমতি আল্লাহ প্রদান করেননি। কারণ, তাওয়াফ একটি ইবাদত। আর আল্লাহ আমাদেরকে কোনো প্রকার ইবাদত তৈরি করতে সতর্ক করেছেন। অতএব কুরআন ও সুন্নাহর সহীহ দলীলের বাইরে কোনো ইবাদত নেই। সুতরাং শরয়ীতের সুস্পষ্ট দলীল ব্যতীত ইবাদত তৈরি করা বিদ্রোহ করা এবং সেটি গাইরুল্লাহ এর জন্য সমর্পণ করা এমন শির্ক, যা আমল বিনষ্টকারী এবং দীনে খালেস থেকে বের করে কুফরের দিকে নিক্ষেপকারী। আমরা আল্লাহর নিকট এ থেকে আশ্রয় চাই।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনটি মসজিদ (মাসজিদুল হারাম, মাসজিদুন নবী ও মাসজিদুল আকসা) ব্যতীত অন্য কোনো ভূ-খন্ড ও স্থানের সম্মানে সফর করা কি বৈধ?
উত্তর: বল, তিনটি মাসজিদ ব্যতীত অন্য কোনো স্থান ও ভূ-খণ্ডকে সম্মানিত ভেবে তার উদ্দেশ্যে সফর করায় ফযীলত আছে বিশ্বাস করে সফর করা বৈধ নয়।কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তিনটি মাসজিদ: মাসজিদুল হারাম, আমার এ মাসজিদ ও মাসজিদুল আকসা ব্যতীত কোনো স্থানে সফর করা যাবে না”। হাদীসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, নিম্নের হাদীসগুলো কি সহীহ, না রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অপবাদ? যেমন বলা হয়ে থাকে, তিনি বলেছেন, “যখন তোমাদের বিষয়াদি কঠিন হয়, তখন তোমাদের ওপর কর্তব্য হলো, কবর যিয়ারত করা”। অনুরূপ “যে হজ করল কিন্তু আমার যিয়ারত করল না, সে আমার সাথে দুর্ব্যবহার করল”। অনুরূপ “যে একই বছর আমার ও আমার পিতা ইবরাহিমের কবর যিয়ারত করবে আমি তার জন্যে আল্লাহর পক্ষ হতে জান্নাতের জিম্মাদার হয়ে যাবো”। অনুরূপ “যে আমার মৃত্যুর পর আমার কবর যিয়ারত করলো, সে যেন আমার জীবদ্দশায় আমার সাথে সাক্ষাৎ করলো”। অনুরূপ যে কোনো জিনিসে বিশ্বাস করবে সে জিনিস তাকে উপকার করবে”। অনুরূপ “তোমরা আমার সম্মান দ্বারা উসিলা গ্রহণ কর। কারণ আমার সম্মান আল্লাহর নিকট অনেক বড়”। অনুরূপ “হে আমার বান্দা আমার অনুসরণ কর, তাহলে আমি তোমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করব, যারা কোনো জিনিসকে হতে বললেই হয়ে যায়”। অনুরূপ “নিশ্চয় আল্লাহ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নুর থেকে সকল মাখলুক সৃষ্টি করেছেন”।
উত্তর: বল, এ হাদীসগুলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর মিথ্যা অপবাদ। কবর ও মাজার পূজারীরা এগুলো প্রচার করে। বস্তুত যিনি কোনো বস্তুকে কুন বললে হয়ে যায় তিনি হলেন আল্লাহ তা‘আলা। তিনি এক। তার কোনো শরীক, সমকক্ষ ও সদৃশ নেই। আমরা তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা ও প্রশংসা করি। নবী, অলী বা অন্য কোনো মাখলুক এরূপ করতে পারে না। তারা এর মালিকও নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿إِنَّمَآ أَمۡرُهُۥٓ إِذَآ أَرَادَ شَيۡ‍ًٔا أَن يَقُولَ لَهُۥ كُن فَيَكُونُ ٨٢﴾ [يس: ٨٢]    “তাঁর ব্যাপারটি এরূপ যে তিনি যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করতে চান, তখন কেবল বলেন, হও। সাথে সাথেই তা হয়ে যায়”। [সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৮২] তিনি আরো বলেন, ﴿أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُۗ تَبَارَكَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٥٤﴾ [الاعراف: ٥٣]   “জেনে রেখো! সৃষ্টি ও নির্দেশ তাঁরই। জগতসমূহের রব আল্লাহ তা‘আলা বরকতময়”। [সূরা আল-আরাফ: ৫৪] সীমাবদ্ধতার অর্থ বর্ণনা করার জন্য এখানে পরে আসার শব্দকে আগে আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে সৃষ্টি ও ব্যবস্থাপনাকে আল্লাহর জন্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, মাসজিদের ভিতরে মৃতদের দাফন করা ও কবরের ওপর মাসজিদ নির্মাণ করা কি বৈধ?

উত্তর: বল, এটা জঘন্য হারাম ও ভয়ানক বিদ‘আতের অন্তর্ভুক্ত এবং এটি শির্কে লিপ্ত হওয়র সবচেয়ে বড় বড় উসিলা ও মাধ্যমসমূহের অন্যতম। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যু শয্যায় শায়িত অবস্থায় বলেন,“আল্লাহ ইহুদী ও খৃস্টানদের ওপর লানত করুন। তারা তাদের নবীগণের কবরসমূহকে মাসজিদ বানিয়েছে”। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, “তাদের কর্ম থেকে তিনি সতর্ক করছিলেন”। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম) জুনদুব বিন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, “তিনি মৃত্যুর তিন দিন পূর্বে বলেছেন: স্মরণ রেখো, তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তারা তাদের নবী ও নেককার লোকদের কবরসমূহকে মাসজিদ বানাতো। খবরদার তোমরা কবরকে মাসজিদে পরিণত কর না। আমি তোমাদেরকে এ থেকে নিষেধ করছি”। হাদীসটি সহীহ মুসলিম বর্ণনা করেছেন। কবরের ওপর নির্মিত মাসজিদে সালাত আদায় করা বৈধ নয়। কোনো কবর বা কবরসমূহের ওপর মাসজিদ নির্মাণ করা হলে তা ধ্বংস করা ওয়াজিব। আর যদি কবরহীন জায়গায় মসজিদ নির্মাণ করা হয়, অতঃপর তাতে কোনো মৃতকে দাফন করা হয়, তাহলে মাসজিদ ধ্বংস করা হবে না। তবে কবর খুড়ে তা থেকে মৃত ব্যক্তিকে উঠিয়ে সাধারণ গোরস্থানে স্থানান্তর করা হবে।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, কবরের ওপর ঘর বা অন্য কিছু নির্মাণের হুকুম কি?
উত্তর: বল, কবরের ওপর কোন কিছু নির্মাণ করা ঘৃণিত বিদআত। কারণ এতে দাফন-কৃত ব্যক্তির প্রতি সম্মান দেখাতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করা হয় এবং এটি শির্কের উসিলা। তাই এ বিদ‘আত বন্ধে ও শির্কের উসিলাকে রুদ্ধ করণার্থে কবরের ওপর নির্মিত স্থাপনা অপসারণ ও সেটাকে মাটির সমান করা জরুরি। ইমাম মুসলিম আবুল হায়াজ আসাদি হায়ান বিন হুসাইন থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: আমাকে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে যে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন আমি কি তোমাকে তা দিয়ে পাঠাবো না? কোনো ছবি নিঃশেষ করা ব্যতীত রাখবে না এবং কোনো উঁচু কবর মাটির সমান না করে ছাড়বে না”।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কি শুরু থেকেই মাসজিদে দাফন করা হয়েছে?
উত্তর: বল, তাকে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে দাফন করা হয়েছে। সেখানে কবরটি থাকাবস্থা ৮০ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর এক উমাইয়্যা খলীফা মসজিদে নববী সম্প্রসারণ করার ফলে ঘরটি প্রায় মাসজিদের ভেতর দেখায়। সে সময়কার আলেমগণ ঘরটিকে মাসজিদের ভিতের দাখিল করতে নিষেধ ও সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু খলিফা তাদের কথা শ্রবণ করেননি। অথচ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবরের ওপর মাসজিদ নির্মাণ করা থেকে সতর্ক করে বলেন: “জেনে রেখো, তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তারা কবরকে মাসজিদ বানাতো, খবরদার তোমরা কবরকে মাসজিদ বানিয়ো না, কারণ আমি তোমাদেরকে তা থেকে নিষেধ করছি”। হাদীসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবরের ওপর মাসজিদ নির্মাণকারী ও তাতে বাতি প্রজ্বলিত-কারীদেরকে অভিসম্পাত করেছেন। যেমনটি পাওয়া যায় সে হাদীসে যেটি সুনান গ্রন্থকারগণ বর্ণনা করেছেন। মূর্খতার প্রাধান্য, বিদ‘আত ও কুসংস্কার পন্থীদের ধোঁকাবাজির কারণে আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরোধিতা করে মাসজিদে কবর দেয়া, তাতে সমাধি তৈরি করা, তার উপর পর্দা ঝুলানো, তাতে বাতি জ্বালানো, তাওয়াফ করা এবং তার উপর মানত ও দানবাক্স রাখা ইত্যাদিকে তারা আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের কারণ বানিয়েছে। অতএব নেককার লোকদের ভালোবাসা, তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের মাধ্যমে রাব্বুল আলামীনের প্রতি মনোনিবেশ করা যাতে দু‘আকারীতের ডাকে সাড়া দেয়, ইত্যাদির নামে শির্ক ও বিদআতে ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলো সবই পূর্বের গোমরাহ লোকদের পরিত্যক্ত বিভ্রান্তি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা অবশ্যই পূর্ববর্তীদের রীতি-নীতির অনুসরণ করবে। যেমন এক পালক অপর পালকে সমান হয়। তাদের কেউ যদি ধাব্ব (গুইসাপ) এর পরিত্যক্ত গর্তে প্রবেশ করে তোমরাও তাতে প্রবেশ করবে”। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি কবরে জীবিত, তিনি কি মীলাদুন্নবী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন, যেমন কতক লোক তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী “হযরত” নামকরণ করেছে?

উত্তর: বল, চার ইমামসহ মুসলিম জাতির সমস্ত আলেম একমত যে সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রূহ তার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পূর্বে দাফন করেননি। কেননা তাকে জীবিত দাফন করা যুক্তিযুক্ত নয়!! এ ছাড়াও তার মারা যাওয়ার পরই তাঁরা খলিফা নির্ধারণ করেছেন এবং তার মেয়ে ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহা তার মিরাস চেয়েছেন। কোনো সাহাবী, তাবেঈ অথবা তাদের অনুসারী চার ইমামের কারো থেকে বর্ণিত হয়নি যে, তার মৃত্যু ও দাফন কার্য সমাধা হওয়ার পর তিনি মানুষের জন্যে বের হয়েছেন। অতএব যে দাবি করে, তিনি কবর থেকে মানুষের জন্য বের হন সে কুসংস্কারাচ্ছন্ন, মিথ্যুক, শয়তান তাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করছে এবং সে আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অপবাদ আরোপকারী। কিভাবে এটি সম্ভব? অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٞ قَدۡ خَلَتۡ مِن قَبۡلِهِ ٱلرُّسُلُۚ أَفَإِيْن مَّاتَ أَوۡ قُتِلَ ٱنقَلَبۡتُمۡ عَلَىٰٓ أَعۡقَٰبِكُمۡۚ ١٤٤﴾ [ال عمران: ١٤٤] “মুহাম্মাদ কেবল একজন রাসূল। তাঁর পূর্বে নিশ্চয় অনেক রাসূল বিগত হয়েছে। যদি সে মারা যায় অথবা তাকে হত্যা করা হয়, তবে তোমরা কি তোমাদের পেছনে ফিরে যাবে”? [সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৪৪] অনুরূপ তার বাণী:  ﴿إِنَّكَ مَيِّتٞ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ ٣٠﴾ [الزمر: ٣٠]  “নিশ্চয় তুমি মরণশীল এবং তারাও মরণশীল”। [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৩০] আল্লাহ তা‘আলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর সংবাদকে অন্যান্য মানুষের মৃত্যুর সংবাদের সাথে যোগ করেছেন,যাতে এটি সুস্পষ্ট হয় যে, প্রকৃতপক্ষেই তাঁর মৃত্যু হবে এবং তিনি এই দুনিয়া থেকে বারযাখের জীবনে চলে যাবেন, যেখান থেকে তিনি পুনরুত্থান ও কবর থেকে বের হওয়ার পর কিয়ামতের ময়দানে মানুষ যখন হিসাব-নিকাশ ও বিনিময় গ্রহণের জন্যে জড়ো হবে সেদিনের পূর্বে তিনি বের হবেন না। যেসব মূর্খ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন লোক বিশ্বাস করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবর থেকে বের হন, তাদের প্রতিবাদে ইমাম কুরতুবি মালিকীর (মৃত ৬৫৬ হি:) কথা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি তার “আল-মুফহাম” নামক কিতাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কবর থেকে বের হওয়ার কুসংস্কার সম্পর্কে বলেন, “সাধারণ বিবেক-বুদ্ধি দ্বারাই এর অসারতা বুঝা যায়। এ থেকে আবশ্যক হয় যে, তিনি যে অবস্থায় মারা গেছেন, তাকে সে আকৃতি ছাড়া অন্য কোন আকৃতিতে না দেখা, একই মুহূর্তে দু’স্থানে দু’জন তাকে না দেখা, এখনো জীবিত থাকা ও কবর থেকে বের হওয়া, বাজারে চলাচল করা এবং মানুষকে তার সম্বোধন করা এবং তারাও তাকে সম্বোধন করা। এতে তাঁর কবরটি তার শরীর থেকে খালি থাকা এবং তাঁর কবরে কিছুই না থাকা। অতএব শুধু কবরকে যিয়ারত করা এবং অনুপস্থিতকে সালাম দেওয়া হয়। কেননা দিন ও রাতের বিভিন্ন সময়ে তাঁকে তার অবিকল চেহারায় কবর ছাড়া অন্যত্র দেখা যাওয়া সম্ভব। বস্তুত এ গুলো সবই মূর্খতা, যার সামান্য বিবেকও আছে সে তা স্বীকার করে না”। শেষ হল।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয় বিদ‘আত কি? তার প্রকারগুলো কি? প্রত্যেক প্রকারের বিধান কি? ইসলামে বিদ‘আতে হাসানাহ বলতে কিছু আছে কি?
উত্তর: বল,শরী‘য়াতের দলীল ব্যতীত বান্দা যা দিয়ে তার রবের ইবাদত করে তাকেই বিদ‘আত বলা হয়। এটি দুই প্রকার। (১) কাফিরে পরিণতকারী বিদ‘আত: যেমন কবরবাসীর নৈকট্য হাসিল করার জন্যে কবরের চারপাশে তাওয়াফ করা এবং (২) এটি এমন বিদ‘আত, যার কারণে ব্যক্তি পাপী হয়। তবে তাতে কাফির হয় না। যেমন শির্কে ও কুফরি কর্মকাণ্ড ব্যতীত নবী ও অলীর মীলাদ উদযাপন করা। ইসলামের মধ্যে বিদ‘আতে হাসানাহ বলতে কিছু নেই। প্রত্যেক বিদ‘আতই গোমরাহী। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমরা নব্য বিদ‘আত থেকে সতর্ক থাক। কেননা প্রত্যেক নতুন ইবাদত বিদ‘আত। আর প্রত্যেক বিদ‘আত গোমরাহী”। অপর বর্ণনায় এসেছে, “আর প্রত্যেক গোমরাহীর পরিণাম জাহান্নাম”। হাদীসটি আহমদ ও নাসায়ী বর্ণনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো বিদ‘আতকে ছাড় দেননি। প্রত্যেক বিদ‘আতই হারাম এবং বিদ‘আত সৃষ্টিকারী ব্যক্তি কোনো সাওয়াব পাবে না। কারণ বিদ‘আত তৈরি করা শরীয়তকে সংশোধন করা ও দীন পরিপূর্ণ ও কামিল হওয়ার পরও তাতে বৃদ্ধি করার সামিল। তাই তার বিদআত তার ওপরই প্রত্যাখ্যাত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে আমাদের দীনে নতুন কিছু সৃষ্টি করল তা প্রত্যাখ্যাত”। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। এখানে ‘আমরিনা’ অর্থ ইসলামে।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “যে কোনো সুন্দর সুন্নাত উদ্ভাবন করবে, সে তার সাওয়াব পাবে এবং যে তার ওপর আমল করবে তার সাওয়াবও পাবে” এ থেকে কি বুঝা যায়?
উত্তর: বল: “যে কোনো সুন্দর সুন্নাত উদ্ভাবন করবে” অর্থাৎ এমন আমল করবে যেটা ইসলাম নিয়ে এসেছে। কিন্তু মানুষ ভুলে গিয়েছে। অথবা এমন বিষয়ের দিকে আহ্বান করবে, যা মানুষের কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে রয়েছে। তবে মানুষের মধ্যে সে বিষয়ে অজ্ঞতা রয়েছে। এমন সুন্নাতের দিকে দাওয়াত দিলে সে অনুসারীর সাওয়াব পাবে। কারণ এ হাদীসের উপলক্ষ ছিল ঐসব ফকীরদেরকে সাদকা করার আহ্বান করা, যারা মানুষের নিকট প্রার্থনা করত। আর যিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো সুন্দর সুন্নাত উদ্ভাবন করল” তিনিই বলেছেন: “প্রত্যেক বিদ‘আত গোমরাহী”। সুন্নাতের উৎস কুরআন ও সুন্নাহ। আর বিদআতের পক্ষে কুরআন ও সুন্নাহর কোনো দলীল নেই। বরং এটি হচ্ছে পরবর্তী কতক লোকের বিবেক প্রসূত সুন্দর ভাবা মাত্র।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তারাবীর সালাত প্রসঙ্গে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর কথা “খুব সুন্দর বিদ‘আত” থেকে কি বুঝা যায় এবং উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর যুগে দ্বিতীয় আযান বৃদ্ধি করার হুকুম কি?
উত্তর: বল, তারাবীর সালাত সম্পর্কে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর উক্তি: “এটি খুব সুন্দর বিদ‘আত” দ্বারা বিদ‘আতের আভিধানিক অর্থ উদ্দেশ্য। শরী‘ঈ অর্থ উদ্দেশ্য নয়। কেননা উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বাক্যটি কেবল সেই তারাবীর সালাত প্রসঙ্গে বলেছেন, যা তিনি চালু করেছেন। তাই তার কর্মটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্মের অনুসরণ মাত্র। আর যেটি রাসূলের কর্মের পুনরুজ্জীবিত করা তা বিদ‘আত নয়; বরং তা হলো নতুনত্ব করা ও মানুষকে বিস্মৃত ও পরিত্যক্ত সুন্নাত স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে যার দিকে আহ্বান ও আমল করেছেন তার প্রতি দাওয়াত দেওয়া।আর উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর কর্মটি সে সব ব্যক্তির কর্মের অন্তর্ভুক্ত যাদের অন্যান্য খলীফায়ে রাশেদীনের সাথে স্বীয় সুন্নাতের অনুসরণ করতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওয়াত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “তোমরা আমার সুন্নাত ও হিদায়াতপ্রাপ্ত খলীফাদের সুন্নাতের অনুসরণ কর”। হেদায়াতপ্রাপ্ত খলীফাগণ ছাড়া অন্যান্যরা তাদের মতো নয়। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুন্নাতকে তাঁর সাথে ও তাঁর পরে হিদায়াত প্রাপ্ত খলীফাগণের সাথে খাস করেছেন। অন্যদের কথা তিনি উল্লেখ করেননি। অথচ সাহাবীগণও বিদ‘আত ও নতুন উদ্ভাবন থেকে সতর্কতা ব্যাপারে অধিক কঠোর ছিলেন। তাদের একজন হলেন ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু যিনি দীনের মধ্যে বিদ‘আত সৃষ্টিকারী একদল লোককে বলেছেন, যারা ভালো উদ্দেশ্যে দলবদ্ধভাবে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে আল্লাহর যিকির করছিল। “তোমরা কি জ্ঞানের দিক দিয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদেরকে ডিঙ্গিয়ে গেছো? নাকি অন্যায়ভাবে বিদ‘আত নিয়ে এসেছো? উত্তরে যখন তারা বলল, “আমরা ভালো নিয়তে করছি”। তিনি তাদের বললেন, “যতজন কল্যাণের ইচ্ছা করে, সে সঠিক করে না।” দারিমী স্বীয় সুনানে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। অনেক সময় তিনি তার মজলিসে স্বীয় সাথীদের বার বার বলতেন, “তোমরা অনুসরণ কর; কিন্তু বিদ‘আত করো না”। ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “প্রত্যেক বিদ‘আত গোমরাহী, যদিও মানুষ তা উত্তম মনে করে”।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, মীলাদুন্নবী উদযাপন সুন্নাত না বিদ‘আত?
উত্তর: বল, মীলাদুন্নবী উদযাপন করার নির্দেশ কিতাব ও সুন্নাতের কোথাও আসেনি। শরয়ীতে এর কোনো দলীলও নেই। কোনো সাহাবী থেকে এটি প্রমাণিত নয় এবং চার ইমামের কোনো ইমাম এটি করতে বলেননি। এটি যদি ভালো ও আনুগত্য হত তবে আমাদের আগেই তারা করতেন। মীলাদ উদযাপনকারীরা বলে, তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মীলাদুন্নবী উদযাপন করে। বস্তুত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরযে আইন। তাঁকে ভালোবাসা ব্যতীত কারো ঈমান বিশুদ্ধ হয় না। তবে তা হয় তার আনুগত্যের মাধ্যমে; তার মীলাদ উদযাপন করার মাধ্যমে নয়। এটি সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেছে নাস্তিক বাতেনী উবাইদী নামক ফিরকা। তারা নিজেদের ফাতেমী বলত। এটি ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর চারশো বছর পরের ঘটনা। মীলাদ উদযাপনকারীরা সোমবার দিন মীলাদ (জন্মদিবস) উদযাপন করে থাকে। অথচ সেটি হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যু-দিবস। প্রকৃতপক্ষে মীলাদুন্নবী উদযাপন খ্রিস্টানদের ঈসা আলাইহিস সালামের মীলাদ উদযাপন করার অনুসরণ ছাড়া কিছুই নয়। আল্লাহ আমাদেরকে পরিপূর্ণ, পরিচ্ছন্ন, পবিত্র ও নির্ভেজাল শরীয়ত দিয়ে পথভ্রষ্ট জাতিসমূহের বিদ‘আত, নতুন সৃষ্ট কুসংস্কার থেকে মুক্ত রেখেছেন। সমগ্র সৃষ্টি-জগতের রব আল্লাহর জন্য সমস্ত প্রশংসা।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, যাদু শেখা বা সে অনুযায়ী আমল করার হুকুম কি?
উত্তর: বল, যাদু শেখা ও শেখানো জায়েয নয়। আর যাদু করা কুফরি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿وَٱتَّبَعُواْ مَا تَتۡلُواْ ٱلشَّيَٰطِينُ عَلَىٰ مُلۡكِ سُلَيۡمَٰنَۖ وَمَا كَفَرَ سُلَيۡمَٰنُ وَلَٰكِنَّ ٱلشَّيَٰطِينَ كَفَرُواْ يُعَلِّمُونَ ٱلنَّاسَ ٱلسِّحۡرَ وَمَآ أُنزِلَ عَلَى ٱلۡمَلَكَيۡنِ بِبَابِلَ هَٰرُوتَ وَمَٰرُوتَۚ وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنۡ أَحَدٍ حَتَّىٰ يَقُولَآ إِنَّمَا نَحۡنُ فِتۡنَةٞ فَلَا تَكۡفُرۡۖ فَيَتَعَلَّمُونَ مِنۡهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِۦ بَيۡنَ ٱلۡمَرۡءِ وَزَوۡجِهِۦۚ وَمَا هُم بِضَآرِّينَ بِهِۦ مِنۡ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذۡنِ ٱللَّهِۚ وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمۡ وَلَا يَنفَعُهُمۡۚ وَلَقَدۡ عَلِمُواْ لَمَنِ ٱشۡتَرَىٰهُ مَا لَهُۥ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ مِنۡ خَلَٰقٖۚ ١٠٢ ﴾ [البقرة: ١٠٢]  “তারা অনুসরণ করেছে, যা শয়তানরা সুলাইমানের রাজত্বে পাঠ করত। আর সুলাইমান কুফরি করেননি; বরং শয়তানরাই কুফরি করেছে। তারা মানুষকে যাদু শেখাত এবং যা নাযিল করা হয়েছিল বাবেলের ফিরিশতাদ্বয় হারূত ও মারূতের প্রতি। তারা কাউকে শেখাত না যে পর্যন্ত না বলত, আমরা পরীক্ষা স্বরূপ মাত্র। সুতরাং তোমরা কুফরি করো না। এরপরও তারা এদের কাছ থেকে তাই শিখত, যার মাধ্যমে তারা পুরুষ ও তার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত। অথচ তারা আল্লাহর অনুমতি ছাড়া এ দ্বারা কারো ক্ষতি করতে পারত না । আর তারা শিখত যা তাদের ক্ষতি করত, তাদের উপকার করত না এবং তারা অবশ্যই জানত, যে তা ক্রয় করবে, আখিরাতে তার কোন অংশ নেই”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১০২] অনুরূপ তার বাণী: ﴿يُؤۡمِنُونَ بِٱلۡجِبۡتِ وَٱلطَّٰغُوتِ ٥١﴾ [النساء : ٥١]   “তারা যিবত ও তাগুতের প্রতি ঈমান আনে”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫১]
জিবতের ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলেছেন, উহা হলো যাদু। আল্লাহ তাগুতের সাথে যাদুকে মিলিয়ে উল্লেখ করেছেন। তাই তাগুতের প্রতি ঈমান আনয়ন করা যেমন কুফরি তেমনি যাদু অনুযায়ী আমল করাও কুফরি। তাই তাগুতকে অস্বীকার করার দাবি হচ্ছে যাদুর অসারতায় বিশ্বাস করা এবং যাদু একটি নিকৃষ্ট ও দীন-দুনিয়া বিধ্বংসী বিদ্যা বলে জানা, যা থেকে দূরে থাকা এবং যাদু ও যাদুকর থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করা ওয়াজিব।

হাদীসে এসেছে, “যে ঘিরা বাঁধল অতঃপর তাতে ফুঁ দিল সে যাদু করল, আর যে যাদু করল সে শির্ক করল”। এটি নাসায়ী ও বাযযার বর্ণনা করেছেন, “যে কুলক্ষণ গ্রহণ করল ও যার জন্যে তা করা হল অথবা যে গণনা করল অথবা যার জন্যে গণনা করা হল অথবা যে যাদু করল অথবা যার জন্যে যাদু করা হল সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়”। যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে হত্যা করা। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু তার গভর্নরদের লিখে পাঠিয়েছেন, “প্রত্যেক যাদুকর পুরুষ ও নারীকে হত্যা কর”। (সহীহ বুখারী) জুনদুব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তলোয়ারের আঘাতে হত্যা করা”। (তিরমিযী)। হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহা তার এক দাসীকে হত্যা করেছেন, যে তাকে যাদু করেছিল।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ভেলকিবাজরা যা করে, যেমন নিজেদেরকে আহত করা ও কঠিন পদার্থ ভক্ষণ করা কি যাদু ও ভেলকিবাজি? না কারামাত?
উত্তর: বল, ভেলকিবাজরা উল্লেখিত যেসব কাজ করে, তা করতে কেবল শয়তানরাই তাদের সাহায্য করে এবং এগুলো থেকে কিছু কর্ম দ্বারা মানুষের চোখকে যাদু করা হয়। ফলে যেটা বাস্তব নয় সেটাকে তারা বাস্তব হিসেবে দেখে। যেমন যাদুকররা মূসা আলাইহিস সালাম ও উপস্থিত লোকদের ক্ষেত্রে করেছিল। ঘটনাটি আল্লাহ কুরআনে উল্লেখ করেছেন। মূসা আলাইহিস সালামকে দেখানো হয়েছিল যে, যাদুকরদের রশিগুলো দৌঁড়াচ্ছে। বাস্তবে তা দৌঁড়াচ্ছিল না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿يُخَيَّلُ إِلَيۡهِ مِن سِحۡرِهِمۡ أَنَّهَا تَسۡعَىٰ ٦٦﴾ [طه: ٦٦]  “তাদের যাদুর প্রভাবে মনে হল যেন সেটি ছুটাছুটি করছে”। [সূরা তোহা, আয়াত: ৬৬] ভেলকিবাজদের নিকট আয়াতুল কুরসি, সূরা নাস ও ফালাক, ফাতিহা, সূরা বাকারার শেষ আয়াত ও অন্যান্য আয়াত পাঠ করা হলে আল্লাহর ইচ্ছায় যাদু ও ভেলকিবাজি নষ্ট হয়ে যায় এবং তাদের ভেলকিবাজি ও মিথ্যাচার খুলে যায় এবং মানুষের সামনেও তাদের বাতিল ও মিথ্যা প্রকাশ পেয়ে যায়।

নেককার, তাওহীদের অনুসারী, বিদ‘আত ও কুসংস্কার মুক্ত লোক ব্যতীত অন্য কারো জন্যে কারামত হাসিল হয় না। মূলত কারামাত হচ্ছে মুমিনের জন্য কল্যাণ হাসিল হওয়া অথবা তার থেকে অনিষ্ট দূরীভূত হওয়া। এর অর্থ এটা নয় যে, যার জন্য কারামত হাসিল হয়েছে সে ঐসব মুমিনের চেয়ে উত্তম, যাদের জন্য কারামত হাসিল হয়নি। কারামাতের ব্যাপারটি গোপন করা এবং প্রচার করা উচিৎ নয়। কারামাত দ্বারা মানুষের ধন-সম্পদ আত্মসাৎ করা যাবে না এবং তা দ্বারা প্রতারিত করা যাবে না।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, চিকিৎসার জন্যে যাদুকরের নিকট যাওয়ার হুকুম কি?
উত্তর: বল, যাদুকর পুরুষ ও নারীর নিকট যাদু সম্পর্কে জানতে ও তার চিকিৎসার জন্যে যাওয়া বৈধ নয়। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা থেকে নিষেধ করেছেন। তার দলীল হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ‘নুশরাহ’ অর্থাৎ যাদুর মাধ্যমে যাদুর প্রভাব দূর করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছেন, “এটি শয়তানের কাজ”। অর্থাৎ নুশরাহ। হাদীসটি আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন। আর শয়তানদের কোনো কর্ম বৈধ নয় এবং তা দ্বারা উপকৃত হওয়া যাবে না এবং তার থেকে কোনো কল্যাণও আশা করা যাবে না।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, যাদু-গ্রস্ত হওয়ার আগেই তা থেকে বাঁচার উপায় কি এবং যাদু-গ্রস্ত রোগীর চিকিৎসার পদ্ধতি কী?
উত্তর: বল, সকাল ও সন্ধ্যার যিকিরগুলো নিয়মিত পাঠ করা। বিশেষভাবে সকাল ও সন্ধ্যায় “বিসমিল্লাহিল্লাযি লা-য়াদুররু মাআসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস-সামায়ী ওয়া হুওয়াস সামিউল আলীম” তিনবার পড়া। আরো পড়া: “আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাকা”। আর সন্তান ও পরিবারের সুরক্ষা হচ্ছে: “উ-ইযুকুম বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিনকুল্লি শায়তানিও ওয়া হাম্মাতিন ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাতিন”। হাদীসে এরূপই এসেছে। সূরা ইখলাস, সূরা নাস ও ফালাক সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার, আাতুল কুরসি, রাতের বেলা সূরা বাকারার শেষ দু’টি আয়াত পড়া এবং সকাল বেলা সাতটি খেজুর খাওয়া।

আর যাদু সংঘটিত হওয়ার পর চিকিৎসা হলো যাদুগ্রস্তের ওপর সরাসরি কুরআনুল কারীমের আয়াত, সুন্নাতে নববীতে উল্লেখিত দু‘আগুলো পাঠ করা, সিঙ্গা লাগানো এবং যাদু করার বস্তুগুলো স্পষ্ট হলে সেগুলো ধ্বংস করে ফেলা। ইনশা-আল্লাহ এতে যাদু বাতিল হবে এবং যাদু-গ্রস্ত সুস্থ হবে।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, গণক, জ্যোতিষী, যাদুকর, কাপ পড়া দানকারী, হাতের রেখা গণনাকারী এবং নক্ষত্র ও তারকারাজির দ্বারা ভবিষ্যতের জ্ঞান রাখার দাবিদার ও আকাশের কক্ষপথ দ্বারা রাশিচক্র জানার দাবিদারের নিকট যাওয়া কি বৈধ?

উত্তর: বল, তাদের নিকট যাওয়া, প্রশ্ন করা ও তাদের মিথ্যা শ্রবণ করা আমাদের জন্য হারাম। তবে যে তাদের মিথ্যা প্রকাশ, তাদের বানোয়াট স্পষ্ট করা ও তাদের প্রতারণা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে সক্ষম আলেম ও ব্যক্তিবর্গ সেখানে যেতে পারেন। ইলমে গায়েবের দাবিদার প্রত্যেকের থেকে বিরত থাকা এবং তাদের মিথ্যা ও ধোঁকাবাজি থেকে সাবধান অসতর্ক লোকদেরকে সতর্ক করা আবশ্যক। ধ্বংস তার জন্য, যে তাদের মিথ্যা, বাতিল ও ধারণাগুলোকে বিশ্বাস করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “যে কেউ জ্যোতিষী ও গণকের নিকট গেল ও তার কথাকে বিশ্বাস করল সে মুহাম্মাদের ওপর নাযিল-কৃত কুরআনকে অস্বীকার করল”। সুনান গ্রন্থকারগণ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন, “যে কোনো জ্যোতিষীর নিকট গেল ও তাকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস করল চল্লিশ দিন তার সালাত কবুল হবে না”। হাদীসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, “তোমরা যাদু শিক্ষা করো, কিন্তু তার ওপর আমল কর না” হাদীসটি সম্পর্কে তুমি কি বলবে?
উত্তর: বল, এটি মিথ্যা হাদীস এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অপবাদ। যাদু থেকে সতর্ক করে তিনি তা শিখতে কিভাবে উৎসাহ দিতে পারেন!

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, নবীদের পর সর্বোত্তম মানুষ কে?
উত্তর: বল, সাহাবীগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুম। কেননা যখন প্রমাণিত হয়েছে যে, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকল নবীর চেয়ে উত্তম, তাই তার সাথীগণ সকল নবীর সাথীদের থেকে উত্তম। তাদের মধ্যে সর্বোত্তম হলেন আবু বকর। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “নবী ও রাসূলগণের পর আবু বকরের চেয়ে উত্তম কারো ওপর সূর্য উদিত হয়নি এবং অস্ত যায়নি”। অতঃপর ওমার, অতঃপর উসমান, অতঃপর আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম। অতঃপর বাকি দশজন জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত সাহাবী। সাহাবীগণ একে অপরকে খুব ভালোবাসতেন। এ জন্যেই আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু তার সন্তানদের নাম রেখেছেন তার পূর্বের খলিফাগণের নামে। যেমন তার সন্তানদের মধ্যে আবু বকর, উমার ও উসমান নাম রয়েছে। যে বলে সাহাবীগণ আহলে-বাইতের মুমিন সদস্যদের ভালোবাসতেন না, তার কথা মিথ্যা। এটি মূলত সাহাবী ও আহলে-বাইতের শত্রুদের বানানো মিথ্যা।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, সাহাবীগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুমের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কি এবং তাদের কাউকে গাল-মন্দ করার হুকুম কি?
উত্তর: বল, তাদের সবাইকে ভালোবাসা, সম্মান ও শ্রদ্ধা করা এবং তাদের সবার ক্ষেত্রে রাদিয়াল্লাহু আনহুম বলা ওয়াজিব। কারণ আল্লাহ তাদের সবার ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাদের কাউকে এর থেকে বাদ রাখেননি। যেমন তিনি বলেন, وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ “আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা তাদেরকে অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহা সাফল্য”। [সূরা তাওবাহ, আয়াত: ১০০] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, ﴿۞لَّقَدۡ رَضِيَ ٱللَّهُ عَنِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ إِذۡ يُبَايِعُونَكَ تَحۡتَ ٱلشَّجَرَةِ ١٨﴾ [الفتح: ١٨]   “আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা তোমার কাছে গাছের নিচে বায়‘আত করতে ছিল”। [সূরা ফাতহ,আয়াত: ১৮] আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেন: ﴿وَكُلّٗا وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلۡحُسۡنَىٰۚ ١٠﴾ [الحديد: ١٠]   “আর প্রত্যেকের জন্যই আল্লাহ নেকির ওয়াদা করেছেন”। [সূরা আল-হাদীদ আয়াত: ১০] অনুরূপ মু’মিনদের মায়েদেরকে ভালোবাসা ও সম্মান করা ওয়াজিব এবং তাদের কাউকে গাল-মন্দ করা হারাম। কারণ তা কবিরা গুনাহ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَأَزۡوَٰجُهُۥٓ أُمَّهَٰتُهُمۡۗ ٦﴾ [الاحزاب : ٦]    “আর তার স্ত্রীগণ তোমাদের মা”। [সূরা আহযাব, আয়াত: ৬] অতএব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সকল স্ত্রী মু’মিনদের মা। কারণ আল্লাহ তা‘আলা তাদের কাউকে বাদ দেননি। আর আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমরা আমার সাহাবীদের গাল-মন্দ করো না। তোমাদের কেউ যদি উহুদের সমান স্বর্ণ সাদকা করে, তাদের একজনের এক মুদ ও তার অর্ধেকেও পৌঁছবে না”। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

তাদের এমন সম্মান ও মর্যাদার কারণে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। তারা হলেন সেসব লোক, যারা আল্লাহর দীনের সাহায্যে নিজেদের জান ও সম্পদ ব্যয় করেছেন এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতে আত্মীয় ও অনাত্মীয় সবার সাথেই যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহর রাস্তায় পরিবার ও স্বদেশ ত্যাগ করেছেন। কিয়ামত পর্যন্ত এ উম্মত যত কল্যাণ লাভ করবে তার কারণ হলেন সাহাবীগণ। আল্লাহ যমীন ও তার ওপরের সব কিছুর ওয়ারিস না হওয়া পর্যন্ত তাদের পরে আগত সকল মুমিনের ন্যায় তারা সাওয়াব হাসিল করবেন। তাদের পূর্বে তাদের মত যেমন কেউ ছিল না ঠিক তেমনি তাদের পরেও তাদের মত আর কেউ হবে না। আল্লাহ তাদের সবার ওপর সন্তুষ্ট হন এবং তাদের সবাইকে সন্তুষ্ট করুন। ধ্বংস তার জন্যে যে তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, তাদের গাল-মন্দ করে, তাদের কুৎসা রটনা করে ও তাদের ছিদ্রান্বেষণ করে।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো একজন সাহাবীকে অথবা মু’মিন জননীদের কাউকে গালি দেয় তার শাস্তি কি?
উত্তর: বল, তার শাস্তি হচ্ছে লা‘নত এবং আল্লাহর রহমত থেকে দূরীভূত ও বিতাড়িত করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে আমার সাহাবীদের গাল-মন্দ করে, তার ওপর ফিরিশতা ও সকল মানুষের লা‘নত”। হাদীসটি তাবরানী বর্ণনা করেছেন। যে কোনো সাহাবী রাদিয়াল্লাহু আনহুম অথবা মু’মিন জননীদের কাউকে গাল-মন্দ করে, দায়িত্বশীল ও বিশেষ সংস্থার ব্যক্তিবর্গের ওপর ওয়াজিব হলো শিক্ষা দেওয়ার জন্য তাকে কঠিন শাস্তি প্রদান করা।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, সব ধর্ম একই রকম, এই কথা বলা কি বৈধ?
উত্তর: বল, না, এই কথা বলা ও বিশ্বাস করা বৈধ নয়। এটা কুফরের প্রকারসমূহের অন্যতম কুফর। এটি আল্লাহকে অস্বীকার ও তার হুকুম প্রত্যাখ্যান করা এবং কুফর-ঈমান ও হক-বাতিলকে সমান করার শামিল।বিবেকবান লোক আল্লাহর দীন ও তাগুতের দীনের একত্র করা ও সমান হওয়ার ভ্রান্তিতে কীভাবে সন্দেহ করতে পারে! তাওহীদ ও শির্ক এবং হক ও বাতিল কিভাবে একত্র হতে পারে? দীন ইসলাম হলো সত্য। তা ছাড়া অন্যসব দীন বাতিল। আল্লাহ তাঁর দীনকে পূর্ণ ও তার নিআমতকে সম্পূর্ণ করেছেন। তিনি বলেন, ﴿ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗاۚ ٣﴾ [المائ‍دة: ٣]  “আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দীনকে পূর্ণ করেছি এবং তোমাদের ওপর আমার নিআমত সম্পূর্ণ করেছি এবং তোমাদের জন্য দীন হিসেবে ইসলামকে পছন্দ করেছি”। [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৩] অতএব তাতে হ্রাস ও বৃদ্ধি করা বৈধ নয় এবং তাকে অন্যান্য কুফরি ও তাগুতী ধর্মের সমান করা বা তার সাথে একত্র করা বৈধ নয়। কোনো বিবেকবান মুসলিম এটা বৈধ বলে বিশ্বাস করতে পারে না এবং সামান্য ঈমান ও বিবেকের অধিকারী তার জন্যে চেষ্টা করতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿ وَمَن يَبۡتَغِ غَيۡرَ ٱلۡإِسۡلَٰمِ دِينٗا فَلَن يُقۡبَلَ مِنۡهُ وَهُوَ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ ٨٥ ﴾ [ال عمران: ٨٥]   “আর যে কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য দীন অন্বেষণ করবে, তার থেকে কখনো তা গ্রহণ করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে”। [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ৮৫] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “ঐ সত্তার কসম, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, এই উম্মত থেকে যে কেউ আমার সম্পর্কে শুনবে, হোক সে ইহুদী ও খ্রিস্টান অতঃপর আমি যে দীন নিয়ে প্রেরিত হয়েছি তার ওপর ঈমান না এনেই মারা যাবে, সে অবশ্যই জাহান্নামের অধিবাসী হবে”। হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

প্রশ্ন: যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা ও তাকে এক জানা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের ওপর অটল থাকার ফলাফল কি?

উত্তর: বল, ঈমানের দ্বারাই দুনিয়া ও আখিরাতে আসমান ও জমিনের বরকতসমূহের দরজা উন্মুক্ত হওয়াসহ যাবতীয় কল্যাণ ব্যক্তি, জামা‘আত ও উম্মতের জন্যে হাসিল হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿ وَلَوۡ أَنَّ أَهۡلَ ٱلۡقُرَىٰٓ ءَامَنُواْ وَٱتَّقَوۡاْ لَفَتَحۡنَا عَلَيۡهِم بَرَكَٰتٖ مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ وَلَٰكِن كَذَّبُواْ فَأَخَذۡنَٰهُم بِمَا كَانُواْ يَكۡسِبُونَ ٩٦ ﴾ [الاعراف: ٩٥]   “আর যদি জনপদসমূহের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তাহলে আমি অবশ্যই তাদের জন্য আসমান-জমিনের বরকতসমূহ খুলে দিতাম, কিন্তু তারা অস্বীকার করল। অতঃপর তাদের কৃতকর্মের কারণে আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম”। [সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ৯৬]
অনুরূপ যথাযথভাবে ঈমানের বাস্তবায়ন দ্বারা অন্তরের প্রশান্তি লাভ, আরাম হাসিল এবং বক্ষ উন্মুক্ত হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَتَطۡمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكۡرِ ٱللَّهِۗ أَلَا بِذِكۡرِ ٱللَّهِ تَطۡمَئِنُّ ٱلۡقُلُوبُ ٢٨ ﴾ [الرعد: ٢٨]  “যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়, জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়’। [সূরা আর-রাদ, আয়াত: ২৮] তাওহীদে বিশ্বাসী মু’মি-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের সত্যিকার অনুসারী ব্যক্তি মাত্রই পবিত্র জীবন যাপন করে। সে চিন্তা মুক্ত ও প্রশান্ত আত্মার অধিকারী। হতাশ ও পেরেশান হন না। শয়তানরা তার ওপর ওয়াসওয়াসা, ভয় ও উদ্ভেগ-উৎকণ্ঠাসহ প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। সে দুনিয়ায় নিরাশ ও হতভাগা হয় না। আর সে তার আখিরাতে নি‘আমতপূর্ণ জান্নাতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ مَنۡ عَمِلَ صَٰلِحٗا مِّن ذَكَرٍ أَوۡ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤۡمِنٞ فَلَنُحۡيِيَنَّهُۥ حَيَوٰةٗ طَيِّبَةٗۖ وَلَنَجۡزِيَنَّهُمۡ أَجۡرَهُم بِأَحۡسَنِ مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ ٩٧ ﴾ [النحل: ٩٧]  “যে মুমিন অবস্থায় নেক আমল করবে, পুরুষ হোক বা নারী, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তারা যা করত তার তুলনায় অবশ্যই আমি তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেব”। [সূরা আন-নাহাল, আয়াত: ৯৭]
হে মুসলিম ভাই ও মুসলিম বোন, আল্লাহর এই ওয়াদার অন্তর্ভুক্ত হয়ে তুমি এই সুসংবাদ গ্রহণ করে সফলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও।

পরিশিষ্ট
হে সম্মানিত ভাই… হে সম্মানিত বোন।

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের জন্য দীনকে পরিপূর্ণ করেছেন। আর আমাদের ওপর নি‘আমতকে সম্পূর্ণ করেছেন। আর তিনি আমাদেরকে দীন ইসলাম-সত্য দীন, তাওহীদ এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সাফল্যের পথ দেখিয়েছেন।

হে সম্মানিত ভাই! সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সাহাবীদের বুঝ অনুযায়ী আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহ নির্ভর শরী‘আতের ইলম দিয়ে পাথেয় অবলম্বনের চেষ্টা করা। যাতে আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি, যারা জেনে-বুঝে আল্লাহর ইবাদত করে এবং সন্দেহ ও বিভ্রান্তিকর ফিতনায় নিপতিত হওয়া থেকে নিরাপদ থাকতে পারি। আর কারো মর্যাদা যতই উঁচু হোক না কেন, সে ইলমের পাথেয় অবলম্বনে আদিষ্ট এবং তার প্রতি মুখাপেক্ষী।

তোমার নবী, তার ওপর আল্লাহর সালাত ও সালাম তার রব তাকে আরো বেশি ইলম অর্জন করতে নির্দেশ করছেন। তিনি বলেন, ﴿فَٱعۡلَمۡ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّهُ ١٩﴾ [محمد : ١٩]    “জেনে রাখ, তিনি ছাড়া আর কোনো সত্য ইলাহ নেই”। [সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ১৯] এবং তার রবের নিকট আরো ইলম প্রার্থনা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ﴿ وَقُل رَّبِّ زِدۡنِي عِلۡمٗا ١١٤﴾ [طه: ١١٤]   “আর বল, হে আমার রব আমার ইলম বাড়িয়ে দাও”। [সূরা তোহা, আয়াত: ১১৪] হে আল্লাহর তাওফীক প্রাপ্ত বান্দা! তুমি তোমার নবী ও ইমাম মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শের অনুসরণ কর এবং উভয় জগতে কল্যাণ ও সুউচ্চ মর্যাদার সুসংবাদ গ্রহণ করো। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿يَرۡفَعِ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنكُمۡ وَٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡعِلۡمَ دَرَجَٰتٖۚ وَٱللَّهُ بِمَا تَعۡمَلُونَ خَبِيرٞ ١١﴾ [المجادلة: ١١]  “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে ইলম দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদের মর্যাদা সমুন্নত করবেন। আর তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত”। [সূরা মুজাদালাহ, আয়াত: ১১]
আর ইলম অর্জন করার পর ইলম মোতাবেক আমলকারীদের সাথী হয়ে যাও এবং সংস্কারপন্থী নেককার দলের সঙ্গে মিলিত হতে ইলম ও কল্যাণ ছড়াতে চেষ্টা কর, যাতে তুমি যাদের দাওয়াত দিলে তাদের সাওয়াব পাও এবং যে তোমার দাওয়াতে সাড়া দিবে তার সাওয়াব তোমার জন্যে লেখা হবে। বস্তুত ফরজসমূহ আদায় করার পর ইলম প্রচার ও কল্যাণের দাওয়াত দেওয়ার চেয়ে উত্তম কিছু নেই। মানুষের ওপর হকের দিকে আহ্বানকারীগণের প্রভাব কতই না মহান! বস্তুত তারাই আল্লাহর ইচ্ছায় মূর্খতা, গোমরাহী ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত ব্যক্তিকে মুক্তিদাতা এবং শান্তি, নুর, হিদায়াত ও জান্নাতের পথের দিকে নেওয়ার জন্য তাদের হাত পাকড়াওকারী। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্যে, যিনি জগতসমূহের রব।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Close Menu